ঢাকা, ৩ নভেম্বর ২০২৫: বাংলাদেশে সম্পূর্ণ ডিজিটাল বা ক্যাশলেস ব্যাংকিং সেবা চালুর লক্ষ্যে মোট ১২টি দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছে। অনুমোদন প্রাপ্ত হলে এসব প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদেরকে ইন্টারনেট, মোবাইল অ্যাপ এবং অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা প্রদান করবে—যেখানে কোনো প্রকার শাখা বা নগদ লেনদেন থাকবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সোমবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, আবেদনকারী ১২টি প্রতিষ্ঠান হলো—
| ক্রমিক নং | প্রতিষ্ঠানের নাম / অংশীদারিত্ব | প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংকের নাম |
|---|---|---|
| ১ | ব্রিটিশ বাংলা গ্রুপ | ব্রিটিশ বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি |
| ২ | ডিকে ব্যাংক (ভুটান) | ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান |
| ৩ | ২২টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান | আমার ডিজিটাল ব্যাংক |
| ৪ | ১৬ জন উদ্যোক্তার যৌথ উদ্যোগ | ৩৬ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি |
| ৫ | রবি আজিয়াটা লিমিটেড | বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক |
| ৬ | এনজিও কনসোর্টিয়াম | আমার ব্যাংক (প্রস্তাবিত) |
| ৭ | ইউকে-ভিত্তিক বিনিয়োগকারী ফার্মারস গ্রুপ | অ্যাপ ব্যাংক |
| ৮ | ভিয়ন (বাংলালিংকের মূল কোম্পানি) ও স্কয়ার গ্রুপ | নোভা ডিজিটাল ব্যাংক |
| ৯ | আশা মাইক্রোফাইন্যান্স | মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি |
| ১০ | আইটি সল্যুশনস লিমিটেড | উপকারী ডিজিটাল ব্যাংক |
| ১১ | আকিজ রিসোর্স গ্রুপ | মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংক |
| ১২ | বিকাশ লিমিটেড | বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক |
Table of Contents
ডিজিটাল ব্যাংকের আবেদন প্রক্রিয়া
ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন গ্রহণ শুরু হয় গত ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে এবং প্রথমে নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তবে ব্যাপক আগ্রহের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক সময়সীমা বাড়িয়ে ২ নভেম্বর পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের ১৪ জুন ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের নীতিমালা (Digital Bank Guidelines) প্রকাশ করে, যার মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো শাখাহীন ও পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালুর ভিত্তি স্থাপিত হয়।
ডিজিটাল ব্যাংক: নতুনত্ব, কাঠামো ও সুবিধা
ডিজিটাল ব্যাংক এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা সম্পূর্ণভাবে ইন্টারনেট বা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন নির্ভর সেবা প্রদান করবে। এসব ব্যাংকের কোনো শারীরিক শাখা, উপশাখা, এটিএম বুথ, সিডিএম বা সিআরএম থাকবে না। গ্রাহকরা ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন অ্যাপের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
সেবার ধরন হবে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর—যেখানে থাকবে কিউআর কোড পেমেন্ট, ভার্চুয়াল কার্ড, অনলাইন ফান্ড ট্রান্সফার ইত্যাদি। তবে, প্লাস্টিক কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের সুবিধা থাকছে না।
এই ব্যাংকগুলো গ্রাহকদেরকে অন্য ব্যাংকের এটিএম বা এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে নগদ লেনদেনের সুযোগ দেবে। তবে নীতিমালা অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংকগুলো মাঝারি বা বৃহৎ শিল্পে ঋণ প্রদান করতে পারবে না, এবং ঋণপত্র (এলসি) খোলার অনুমতি থাকবে না। শুধুমাত্র ক্ষুদ্রঋণ ও খুচরা ঋণ প্রদানে তারা সীমাবদ্ধ থাকবে।
আর্থিক কাঠামো ও মূলধন শর্ত
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্স প্রাপ্তির পাঁচ বছরের মধ্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত (IPO) হতে হবে এবং আইপিওর পরিমাণ স্পন্সরদের মূলধনের সমান বা তার বেশি হতে হবে।
প্রত্যেক ডিজিটাল ব্যাংকের একটি প্রধান কার্যালয় (Head Office) থাকবে, তবে কোনো শারীরিক শাখা বা আউটলেট থাকবে না।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে একটি বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন আনবে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠী ব্যাংকবহির্ভূত; ডিজিটাল ব্যাংকের মাধ্যমে এই জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
এই উদ্যোগ বাংলাদেশের “স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৩০” ভিশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা প্রযুক্তিনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক ব্যবস্থার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন,
“ডিজিটাল ব্যাংকের মূল লক্ষ্য হলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া। মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা যেমন দ্রুত বাড়ছে, তেমনি ব্যাংকবহির্ভূত জনগোষ্ঠীকেও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে।”
ডিজিটাল ব্যাংকিং সিস্টেমের সূচনা বাংলাদেশের আর্থিক খাতে এক নতুন যুগের সূচনা করবে—যেখানে গ্রাহকরা সময়, স্থান ও কাগজবিহীনভাবে ব্যাংকিং সেবা পাবেন। এটি কেবল গ্রাহক সুবিধা নয়, বরং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও টেকসই করে তুলবে।
