চলমান অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এবং বৈদেশিক খাতের অনিশ্চয়তা বিবেচনা করে নীতি সুদহার বা পলিসি রেট অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক পর্যালোচনা বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গতকাল ব্যাংকের ওয়েবসাইটে বৈঠকের কার্যবিবরণী প্রকাশ করা হয়।
মুদ্রানীতি কমিটি (এমপিসি) জানায়, জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসা এবং পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে ভোক্তা চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। এই অতিরিক্ত ভোগব্যয় অস্থায়ীভাবে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যদিও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমছে—২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এটি নেমে এসেছে ৮.৩৬%-এ—তবুও পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কিছু অঞ্চলে খাদ্যদ্রব্যের দাম আবার বেড়ে যেতে পারে।
গভর্নর ড. আহসান এইচ মানসুর এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান, চিফ ইকোনমিস্ট ড. মোহাম্মদ আখতার হোসাইন, বিআইডিএস মহাপরিচালক ড. একে এনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর মাসুদা ইয়াসমিন, এবং ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম।
বৈঠকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সামগ্রিক অর্থনীতি পর্যালোচনা করা হয়। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল—মূল্যস্ফীতির বর্তমান ধারা, ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি, নির্বাচন ও রমজানকে সামনে রেখে সম্ভাব্য ঝুঁকি, নীতি সুদের অবস্থান, বৈদেশিক খাতের চাপ, এবং বিনিময় হার পরিস্থিতি।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, আন্তঃব্যাংক কল মানি রেট ও রেপো রেট অল্প কমেছে এবং সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে সুদের হারের ওপর কিছুটা স্বস্তি এসেছে। তবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দুর্বলই রয়েছে, যা এমপিসির মতে নির্বাচনের আগে বিনিয়োগ ঝুঁকি নিতে অনীহা থেকেই ঘটছে।
বৈদেশিক খাতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি মাঝারি ধারা বজায় রাখলেও আমদানি কিছুটা বেড়েছে। রমজান-সংশ্লিষ্ট জরুরি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এলসি মার্জিন শিথিল হওয়ায় এ প্রবণতা স্বাভাবিক বলেই মত দেয় কমিটি। বৈদেশিক আয়—রেমিট্যান্স—স্থিতিশীল থাকলেও তা এখনো সামগ্রিক চাপ পুরোপুরি কমাতে পারছে না।
এমপিসি আরও সতর্ক করে জানায়, কয়েকটি বিষয় মূল্যস্ফীতিকে আবারও উস্কে দিতে পারে—আবহাওয়াজনিত আঘাতে আমন ধানের ক্ষতি, জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্রিক ব্যয় বৃদ্ধি, রমজানের বাড়তি চাহিদা, এবং সম্ভাব্য নতুন সরকারি পে-স্কেল ঘোষণা।
সব দিক বিবেচনায় নীতি সুদহার ১০%-এ অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় কমিটি। পাশাপাশি এসডিএফ হার ৮% এবং এসএলএফ হার ১১.৫% আগের মতোই থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, প্রকৃত নীতি সুদহার ৩%-এ না পৌঁছানো পর্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা হবে, যাতে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা এবং মূল্যস্ফীতি আরও কমানো সম্ভব হয়।
