বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা ও মূলধন নির্বিঘ্নে নিজ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই জটিল ও সময়সাপেক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই বাস্তবতা বিবেচনা করে বেসরকারি ও সরকারি সীমিত কোম্পানিগুলোর বিক্রয় আয় পুনরায় বিদেশে পাঠানোর বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটি একটি বিস্তৃত সংস্কার প্যাকেজ চূড়ান্ত করেছে। এ প্যাকেজে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা কমিয়ে প্রক্রিয়াটি আরও সহজ, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার কমিটি তাদের সুপারিশসমূহ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মন্সুর, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেয়। বিডা এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করে।
বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি ছাড়াই সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা অথবা এর সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা তাদের মূল কোম্পানিতে প্রেরণ করতে পারেন। কিন্তু ক্রমবর্ধমান বিদেশি বিনিয়োগ, লাভজনক শিল্প সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার চাহিদার সঙ্গে এই সীমা এখন অপ্রতুল হয়ে পড়েছে বলে উল্লেখ করেছে কমিটি।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিডার নির্দেশনায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর গঠিত কমিটিটি রিপ্যাট্রিয়েশন বা অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ করে। তাদের কাজ ছিল একটি আধুনিক, কার্যকর ও বিনিয়োগবান্ধব কাঠামো সাজানো, যা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করবে।
কমিটিতে বিডা, বাংলাদেশ ব্যাংক, ইউএনডিপি এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ যুক্ত ছিলেন। তারা একাধিক প্রযুক্তিগত বৈঠক করেন এবং সম্পদ মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ, মার্চেন্ট ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আইনজীবীদের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করেন। এসব আলোচনার ভিত্তিতেই তারা একটি উন্নত সংস্কার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছেন।
সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—রিপ্যাট্রিয়েশন অনুমোদনের সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা। এর ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সরাসরি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন, এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে না। এতে সময় কমবে, প্রক্রিয়া সরল হবে এবং বিনিয়োগকারী-আস্থা বাড়বে।
এ ছাড়া কমিটি সুপারিশ করেছে যে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে সার্ভিস লেভেল এগ্রিমেন্ট (SLA) প্রবর্তন করতে হবে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা অযথা দেরিতে না পড়েন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংস্কার বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। উন্নততর রিপ্যাট্রিয়েশন কাঠামো বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আরও বড় বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
