বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার হস্তান্তর এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ দেশে প্রত্যাবর্তন বা রিপ্যাট্রিয়েশন প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বচ্ছ করতে নতুন মাস্টার সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই নির্দেশনার মাধ্যমে বেসরকারি ও পাবলিক লিমিটেড হলেও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়—এমন কোম্পানিতে অ-নিবাসী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি ও মালিকানা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে সরল করা হয়েছে।
গত ৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইআইডি সার্কুলার নং–০১ জারি করে এই নতুন মাস্টার সার্কুলার প্রকাশ করে। এতে ২০১৮ ও ২০২০ সালে জারি করা বিভিন্ন নির্দেশনাকে একত্র করে হালনাগাদ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন নির্দেশনার লক্ষ্য হলো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগ, শেয়ার হস্তান্তর এবং বিনিয়োগ থেকে প্রস্থান—এই পুরো প্রক্রিয়াকে আরও পূর্বানুমানযোগ্য, দ্রুত এবং স্বচ্ছ করা, একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সুরক্ষা বজায় রাখা।
Table of Contents
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে নতুন পদক্ষেপ
সরকার দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে একটি উচ্চপর্যায়ের ক্যাপিটাল রিপ্যাট্রিয়েশন কমিটি গঠন করা হয়। বিডার নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান রচির নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি গত বছরের ১৯ নভেম্বর সংস্কার প্যাকেজটি চূড়ান্ত করে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, বিনিয়োগ অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা কমানো, শেয়ার বিক্রির অর্থ সহজে দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রের প্রক্রিয়া সরল করার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে এগিয়ে যাচ্ছে।
অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের ক্ষমতা বৃদ্ধি
নতুন সার্কুলারে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোর ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এখন আর বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন হবে না। নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে এডি ব্যাংকগুলোই সরাসরি শেয়ার হস্তান্তর এবং বিক্রয়মূল্য প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে।
এছাড়া লেনদেনের সীমা বৃদ্ধি, মূল্যায়ন পদ্ধতি সহজীকরণ, দ্রুত নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা কাঠামো গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
লেনদেনের সীমা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি
নতুন নির্দেশনায় লেনদেনের ধরন অনুযায়ী আলাদা বিধান রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের লেনদেন দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।
| লেনদেনের ধরন | নতুন বিধান |
|---|---|
| ১ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন | স্বাধীন মূল্যায়ন ছাড়াই ক্রেতা ও বিক্রেতার যৌথ ঘোষণার ভিত্তিতে সম্পন্ন করা যাবে |
| ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন | নির্ধারিত মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করে এডি ব্যাংক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে |
| এনএভি ভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ | অডিট করা আর্থিক বিবরণীর ভিত্তিতে সরাসরি লেনদেন প্রক্রিয়া করা সম্ভব |
মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আগে ব্যবহৃত তিনটি পদ্ধতিই বহাল রাখা হয়েছে—নিট সম্পদমূল্য (Net Asset Value), বাজারমূল্য এবং ডিসকাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো (DCF)। তবে এসব পদ্ধতির ব্যবহার সম্পর্কে নতুন সার্কুলারে আরও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে মূল্য নির্ধারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা কমে।
নির্ধারিত সময়সীমা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
লেনদেন দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য নতুন নির্দেশনায় নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র সম্পূর্ণ থাকলে শেয়ার হস্তান্তর ৪৫ দিনের মধ্যে এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
এছাড়া প্রতিটি অনুমোদিত ডিলার ব্যাংককে জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপনার নেতৃত্বে একটি অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন করতে হবে, যারা মূল্যায়ন এবং অর্থ প্রত্যাবর্তন সংক্রান্ত আবেদন পর্যালোচনা করবে। এডি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া প্রতিটি লেনদেনের বিষয়ে ১৪ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগ থেকে প্রস্থান প্রক্রিয়া সহজ হবে এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। এর ফলে ভবিষ্যতে দেশে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও জোরদার হতে পারে।
