গত এক বছর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ছিল একযোগে সংকট, সংস্কার ও পুনর্গঠনের সময়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার টান—সব মিলিয়ে অর্থনীতি পরিচালনায় সরকারকে নিতে হয়েছে কঠিন ও অজনপ্রিয় অনেক সিদ্ধান্ত। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়টায় অর্থনীতি একদিকে চাপে পড়লেও অন্যদিকে কাঠামোগত সংস্কারের পথে এগোনোর চেষ্টা করেছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে এখনো পুরোপুরি পৌঁছায়নি।
বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের বেশি, যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। টানা তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতিকে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে। চাল, তেল, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের দাম বছরের শুরুতে চড়েছিল, মাঝামাঝি কিছুটা স্বস্তি এলেও শেষ দিকে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি কম হারে বাড়ায় মানুষের প্রকৃত আয় কমছে। বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বারবার বলেছেন, অর্থনীতিকে ‘খাদের কিনারা’ থেকে টেনে তোলাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য এসেছে। প্রবাসী আয় বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন ঠেকানো গেছে। ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল হয়েছে এবং প্রায় বাজারভিত্তিক করা সম্ভব হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগেও সামান্য গতি ফিরেছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা আস্থার ইঙ্গিত দেয়।
তবে এই সময়ের সবচেয়ে বড় নতুন উপাদান হলো অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে বিনিয়োগ স্থবিরতা আরও গভীর হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে, যা ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের জন্য উদ্বেগজনক।
ব্যাংকিং খাত: গভীর সংকট থেকে উত্তরণের লড়াই
ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা ২০২৫ সালে এসে পুরোপুরি প্রকাশ পায়। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও অর্থ পাচারের ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি—দুই ধরনের ব্যাংকেই খেলাপি ঋণের চাপ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিতরণ করা ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখন খেলাপি। এই বাস্তবতায় পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা ব্যাংকিং খাত সংস্কারের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
Table of Contents
এনবিআর আন্দোলন ও রাজস্ব সংকট
অন্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দীর্ঘ আন্দোলন রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়, এমনকি চট্টগ্রাম বন্দরেও এর প্রভাব পড়ে। এর ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা তৈরি হয়।
এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি
কম বরাদ্দের পরও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন গতি ফেরেনি। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাস্তবায়নের হার ১২ শতাংশের নিচে, যা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে শ্লথতার ইঙ্গিত দেয়।
রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে স্বস্তি
সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক অগ্রগতি কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। প্রবাসী কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও শক্ত অবস্থানে ফিরছে।
গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচক (সংক্ষেপে)
| সূচক | সর্বশেষ অবস্থা | আগের অবস্থা |
|---|---|---|
| মূল্যস্ফীতি | ৮.২৯% (নভেম্বর) | ৮.১৭% (অক্টোবর) |
| মজুরি প্রবৃদ্ধি | ৮.০৪% | — |
| বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি | ৬.২৩% (অক্টোবর ২০২৫) | ৮.৩০% (অক্টোবর ২০২৪) |
| বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ | ৩২.৫৭ বিলিয়ন ডলার | ~২৫ বিলিয়ন ডলার (আগস্ট ২০২৪) |
| রেমিট্যান্স (জুলাই–নভেম্বর) | ১৩.০৪ বিলিয়ন ডলার | +১৭.১৪% বৃদ্ধি |
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ অর্থনীতি এখনো সংকটমুক্ত নয়। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিনিয়োগে আস্থা ফেরানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি ছাড়া টেকসই স্বস্তি আসবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
