Muhammad Yunus নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের আর্থিক ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে বৈদেশিক ঋণ প্রায় ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ১১২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার। ফলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আবারও ঋণ বৃদ্ধির গতি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, যা অর্থনীতিবিদদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
আরও দীর্ঘ সময়ের তুলনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ১০৩ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার। সেই হিসেবে প্রায় দেড় বছরের ব্যবধানে মোট ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। এই প্রবণতা উন্নয়ন ব্যয়, বাজেট ঘাটতি পূরণ এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক উৎসের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার ইঙ্গিত দেয়।
বৈদেশিক ঋণের সাম্প্রতিক চিত্র
| সময়কাল | মোট বৈদেশিক ঋণ (বিলিয়ন ডলার) | সরকারি খাত (বিলিয়ন ডলার) | বেসরকারি খাত (বিলিয়ন ডলার) |
|---|---|---|---|
| ২০২৪ আগস্ট | ১০৩.৪১ | তথ্য অনুপস্থিত | তথ্য অনুপস্থিত |
| ২০২৫ সেপ্টেম্বর | ১১২.২১ | ৯২.৫৫ | ১৯.৬৫ |
| ২০২৫ ডিসেম্বর | ১১৩.৫১ | ৯৩.৪৬ | ২০.০৫ |
টেবিল বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির প্রধান অংশ এসেছে সরকারি খাত থেকে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এবং বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারি ঋণের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেসরকারি খাতেও ঋণ কিছুটা বেড়েছে, তবে তা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, চলমান উন্নয়ন ব্যয়, বাজেট ঘাটতি পূরণ এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। গত এক দশকে মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এক্সপ্রেসওয়ে, টানেল এবং বিমানবন্দর সম্প্রসারণসহ একাধিক বৃহৎ প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ ব্যবহৃত হয়েছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাজেট ঘাটতি পূরণ, সরকারি ব্যয় নির্বাহ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার নতুন বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি নয়, বরং এর পরিশোধযোগ্য চাপই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। আগামী কয়েক বছরে বড় অঙ্কের মূলধন ও সুদ পরিশোধ শুরু হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত না হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বৈদেশিক ঋণ উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও এর সঠিক ও উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর তারা গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন হলো, বর্তমান বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে থাকলেও এর কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করা হলে ভবিষ্যতে এটি অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
