বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় সংগ্রহ

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জাতীয় রিজার্ভের ভিত্তি মজবুত করার লক্ষ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে বড় অঙ্কের মার্কিন ডলার ক্রয় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি ২০২৬) কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের ১৪টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট ২২৩ দশমিক ৫০ মিলিয়ন বা ২২ কোটি ৩৫ লাখ মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে। ডলারের এই বিশাল সংগ্রহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি আশাব্যঞ্জক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিনিময় হার ও ক্রয়ের তথ্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই ডলার ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই হারটি লেনদেনের জন্য ‘কাট-অফ’ রেট হিসেবেও প্রযোজ্য হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, বাজারে বর্তমানে ডলারের প্রবাহ সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা উদ্বৃত্ত ডলার সংগ্রহ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে একদিকে ব্যাংকগুলো নগদ টাকার সংস্থান করতে পারছে, অন্যদিকে দেশের রিজার্ভের ঝুলি সমৃদ্ধ হচ্ছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার ক্রয়ের বিস্তারিত পরিসংখ্যান নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের হালনাগাদ চিত্র (২০২৫-২৬)

সময়কালডলার ক্রয়ের পরিমাণ (মিলিয়ন)বিলিয়ন ডলার হিসেবেবিনিময় হার (টাকা)
৬ জানুয়ারি ২০২৬ (একদিনে)২২৩.৫০ মিলিয়ন০.২২ বিলিয়ন১২২.৩০
জানুয়ারি ২০২৬ (এ পর্যন্ত)৪১১.০০ মিলিয়ন০.৪১ বিলিয়ন১২২.৩০
চলতি অর্থবছর (জুলাই–জানুয়ারি)৩,৫৪৬.৫০ মিলিয়ন৩.৫৫ বিলিয়ন১২২.২০ (গড়)

অর্থনৈতিক তাৎপর্য ও বিশ্লেষণ

চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে গত ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে সর্বমোট ৩৫৪ কোটি ৬৫ লাখ মার্কিন ডলার ক্রয় করেছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ডলার ক্রয়ের ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ভারসাম্য ফিরে আসবে। গত কয়েক বছর ধরে ডলারের সংকটে আমদানিকারকরা যে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন, রিজার্ভের এই শক্ত অবস্থান তা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল, খাদ্যশস্য এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে এই মজুদ বড় ধরণের সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করবে।

বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) উচ্চ প্রবাহ এবং রফতানি আয় স্থিতিশীল থাকার কারণে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি এই পর্যায়ে ডলার না কিনত, তবে বাজারে ডলারের দাম অনেক কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকত, যা রফতানিকারক ও প্রবাসীদের জন্য আর্থিকভাবে ক্ষতিকর হতো। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ‘মার্কেট ইন্টারভেনশন’ অত্যন্ত সময়োপযোগী।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, তারা নিয়মিতভাবে বাজার পর্যবেক্ষণ করছে এবং মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা রোধে প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার ক্রয় বা বিক্রয় কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ঋণমান শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

Leave a Comment