বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং ডলারের তারল্য ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থবছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বাজার থেকে প্রায় ৩.৯৩ বিলিয়ন (৩৯৩ কোটি) মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রপ্তানি আয় এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা আয় প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে, যার সুযোগ নিয়ে রিজার্ভ পুনর্গঠনে মনোযোগ দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

সাম্প্রতিক লেনদেন ও বাজার পরিস্থিতি

আজকের সর্বশেষ কার্যদিবসে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট ৫৫ মিলিয়ন (৫.৫ কোটি) ডলার ক্রয় করেছে। এই লেনদেনে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ১২২.৩০ টাকা, যা মূলত ‘কাট-অফ রেট’ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসেই বাজার থেকে ৭৯৮ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে। বিগত কয়েক মাস ধরে ডলারের অন্তর্মুখী প্রবাহ সন্তোষজনক হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও চাপ অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে।

নিচে বর্তমান অর্থবছরের ডলার ক্রয় ও রিজার্ভের সর্বশেষ চিত্র তুলে ধরা হলো:

সারণি: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডলার ক্রয় ও রিজার্ভের পরিসংখ্যান

সূচকের বিবরণতথ্য ও পরিসংখ্যান
চলতি অর্থবছরে মোট ডলার ক্রয়৩.৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
জানুয়ারি ২০২৬-এ এককভাবে ক্রয়৭৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
সর্বশেষ বিনিময় হার (প্রতি ডলার)১২২.৩০ টাকা
মোট গ্রস রিজার্ভ (২২ জানুয়ারি ২০২৬)৩২.৬৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
রিজার্ভ (BPM6 পদ্ধতি অনুযায়ী)২৮.০৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

রিজার্ভ পুনর্গঠনে দীর্ঘমেয়াদী কৌশল

উল্লেখ্য যে, ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত জ্বালানি তেল, সার এবং খাদ্যশস্যের আমদানির ব্যয় মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে তাদের রিজার্ভ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিক্রি করতে হয়েছিল। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয় এবং টাকার মান ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। তবে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেছে। উচ্চ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন ডলার বিক্রির পরিবর্তে বাজার থেকে ডলার কিনে মজুত বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে।

জুলাই মাস থেকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার মান কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ধারাবাহিক ডলার ক্রয়ের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বর্তমানে ৩২.৬৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) নির্ধারিত ‘BPM6’ পদ্ধতি অনুসরণ করলে এই রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৮.০৬ বিলিয়ন ডলার।

আমদানিকারক ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব

বাজার থেকে ডলার ক্রয়ের ফলে একদিকে যেমন রিজার্ভ শক্তিশালী হচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে টাকার সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় তারল্য সংকট নিরসনেও তা সহায়তা করছে। তবে মুদ্রাস্ফীতির ওপর এর প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমদানিকারকরা এখন আগের চেয়ে সহজে ডলার পাচ্ছেন, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, রিজার্ভ যদি ২৮ বিলিয়ন ডলারের (BPM6 অনুযায়ী) উপরে স্থিতিশীল থাকে, তবে তা দেশের বহিঃখাত এবং বৈশ্বিক ঋণমান (Credit Rating) বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, এই ডলার ক্রয়ের ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলা করা সহজ হবে। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় পরিশোধের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে।

Leave a Comment