বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকা নন-পারফর্মিং লোন বা অচল ঋণ (NPL) ব্যবসা-বাণিজ্য খাতের পাশাপাশি উৎপাদনমুখী শিল্প খাতেও বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে অচল ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এত বড় অচল ঋণ দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুতর হুমকি স্বরূপ।
ঋণের পরিসংখ্যান
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে বিতরণকৃত মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৫,৯৪,৬২৪.৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ব্যাংকিং ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশ। এর মধ্যে ৪২ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ২,৪৯,৭৪৪ কোটি টাকা অচল ঋণে পরিণত হয়েছে।
সামঞ্জস্যের জন্য উল্লেখ্য, সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত এই খাতের ঋণ ছিল ৫,৭৪,১৮৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও অচল ঋণের হার সামান্য কমেছে।
শিল্প খাতে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের ৪৩ শতাংশ। ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত এই খাতে বিতরণকৃত ঋণ ছিল ৭,৬৪,১১৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৩০.৮ শতাংশ অচল ঋণে পরিণত হয়েছে।
| খাত | মোট ঋণ (কোটি টাকা) | অচল ঋণ (%) | অচল ঋণের পরিমাণ (কোটি টাকা) |
|---|---|---|---|
| ব্যবসা-বাণিজ্য | ৫,৯৪,৬২৪.৫৫ | ৪২ | ২,৪৯,৭৪৪ |
| শিল্প | ৭,৬৪,১১৭ | ৩০.৮ | ২,৩৫,৪৫৮ |
অচল ঋণের কারণ
ব্যাংকারদের মতে, শিল্প খাতে ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো যথাযথ ঋণ প্রদান নীতি না থাকা এবং রাজনৈতিক প্রভাব। অনেকে পরিচয় ভিন্ন করে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে বিদেশে স্থানান্তর করেন এবং পুনরায় অর্থ ফেরত আনা হয় না।
অন্যদিকে শিল্প উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে দায়ী করছেন। তারা উল্লেখ করছেন, কোভিড পরবর্তী সময়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যয় সময়মতো ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতার কারণ হয়েছে।
সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শিল্প খাতে অচল ঋণের হার ৩৭ শতাংশ থেকে কমে ৩০.৮ শতাংশে এসেছে।
একজন ব্যক্তিগত ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নাম প্রকাশ না করে, বলেন, “এত উচ্চ অচল ঋণ ব্যাংকিং খাতে তীব্র তরলতা সংকট সৃষ্টি করতে পারে। নতুন বিনিয়োগ বাধাপ্রাপ্ত হবে, কর্মসংস্থান কমতে পারে। ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য ব্যাংকগুলি সুদের হার বৃদ্ধি করতে পারে। অনেক ব্যাংক পুঁজির ঘাটতির কারণে অস্তিত্বগত হুমকির সম্মুখীন হতে পারে।”
এতে স্পষ্ট যে, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্প খাতে ঋণের স্থিতিশীলতা পুনঃস্থাপন করা না হলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ পরিবেশ গুরুতর প্রভাবিত হবে।
