ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি), ২০২৬ বিকেলে সচিবালয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি

বৈঠক শেষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, বিগত কয়েক মাসে ব্যাংকিং খাতে গৃহীত সংস্কার উদ্যোগগুলো টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। তিনি স্পষ্টভাবে আশ্বস্ত করেন যে, বিএনপি সরকার এসব সংস্কার কার্যক্রম কেবল অব্যাহতই রাখবে না, বরং সেগুলোকে আরও বেগবান করবে। বিশেষ করে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট সমাধান এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না।

গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, “বিগত কয়েক মাসে আমরা ব্যাংক খাতের আমূল পরিবর্তনের যে রোডম্যাপ তৈরি করেছি, তা মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে উপস্থাপন করেছি। তিনি এই সংস্কার কার্যক্রমের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে খুবই ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।”

খেলাপি ঋণ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ। গভর্নর জানান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বর্তমান সরকারের অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার। জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখতে মুদ্রানীতির কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার ব্যাপারে উভয় পক্ষ একমত পোষণ করেন। খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যে বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা, ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালায় কঠোরতা এবং ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হবে।

নিচে ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা ও গৃহীত পদক্ষেপের একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেওয়া হলো:

প্রধান ক্ষেত্রসমূহগৃহীত ও প্রস্তাবিত পদক্ষেপসমূহ
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণসংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও সরবরাহ চেইন নিয়মিতকরণ।
খেলাপি ঋণ আদায়বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও কঠোর পুনর্গঠন নীতিমালা।
তারল্য ব্যবস্থাপনাআন্তঃব্যাংক ঋণপ্রবাহ সচল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত সহায়তা।
ব্যাংকিং স্বচ্ছতাঋণ শ্রেণিকরণ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (NPL) অনুসরণ।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারদুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা

সম্প্রতি এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী এবং ইউনিয়ন ব্যাংক—এই পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। বৈঠকের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল এই ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কৌশল। উল্লেখ্য যে, এই মেগা ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকার ইতিমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা জোগান দিয়েছে।

গভর্নর জানান, পাঁচটি ব্যাংকের পুরনো আমানতকারীরা ধাপে ধাপে তাদের টাকা ফেরত পাচ্ছেন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সঞ্চার হওয়ায় নতুন আমানতও আসতে শুরু করেছে। তবে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। শীর্ষ মেধাতালিকায় থাকা নাবিল মুস্তাফিজুর রহমান অসুস্থতার কারণে যোগ না দেওয়ায় বর্তমানে ব্যাংকটি প্রশাসক ও পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

এমডি নিয়োগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের বিষয়ে গভর্নর বলেন, যেহেতু পূর্বনির্ধারিত প্রার্থী দায়িত্ব নিতে পারছেন না, তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন কাউকে খুঁজে বের করা হবে। তবে মেধাতালিকার পরের জন সরাসরি নিয়োগ পাবেন কি না, তা এখনই নিশ্চিত করেননি তিনি। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং দক্ষ সদস্য যুক্ত করার বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর সঙ্গে তার ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।

পরিশেষে, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও গভর্নরের এই বৈঠকটি দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেশাদারিত্বের সমন্বয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত শীঘ্রই একটি শক্তিশালী ভিত্তি খুঁজে পাবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

Leave a Comment