২০২৬ সালকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একদিকে যেমন নতুন আশার আলো দেখা যাচ্ছে, তেমনি কিছু কাঠামোগত ঝুঁকিও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সম্ভাব্য গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে বছরটির সূচনা ইতিবাচক হবে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ, বৈশ্বিক মন্দাভাবের রেশ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ—সব মিলিয়ে অর্থনীতির সামনে কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালে দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের সবচেয়ে বড় এজেন্ডা হিসেবে ব্যাংকিং খাতই সামনে আসবে বলে মত দিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।
একান্ত সাক্ষাৎ কারে তিনি বলেন, “২০২৬ সাল একটি টার্নিং পয়েন্ট। গণতান্ত্রিক রূপান্তর সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে বিনিয়োগ কারীদের আস্থা বাড়বে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থিতিশীলতা আসবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরতে পারে।” দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে যে বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সংকোচন ও সাপ্লাই চেইনে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে, সেগুলো কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে ব্যাংকিং খাতে সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসনের ঘাটতি—এই চারটি সমস্যা অর্থনীতির সামগ্রিক গতিকে আটকে রেখেছে। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, “সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা যদি ধারাবাহিক ও মানসম্মতভাবে বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে অর্থনীতি আবারও পুরোনো সংকটে ফিরে যেতে পারে।”
নতুন সরকার গঠনের পর নির্বাচনকেন্দ্রিক চাপ কমে এলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তখন রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ব্যবসার ব্যয় কমানো, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক মানে পৌঁছানোর বিষয়গুলোতে অগ্রগতি সম্ভব। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী না হলে শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।
নিচের সারণিতে ২০২৬ সালে ব্যাংকিং খাতে সম্ভাব্য প্রধান চ্যালেঞ্জ ও করণীয় সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| প্রধান চ্যালেঞ্জ | বর্তমান অবস্থা | সম্ভাব্য করণীয় |
|---|---|---|
| খেলাপি ঋণ | উচ্চ ও কাঠামোগত | কঠোর তদারকি, আইন প্রয়োগ |
| তারল্য সংকট | আস্থার ঘাটতি | মূলধন জোরদার, স্বচ্ছতা |
| সুশাসন | দুর্বল | বোর্ড ও ব্যবস্থাপনায় সংস্কার |
| ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা | সীমিত সক্ষমতা | আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ |
সার্বিকভাবে বলা যায়, ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা ও সতর্কতার বছর। গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, সময়োপ যোগী সংস্কার এবং বিশেষত ব্যাংকিং খাতে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারলে অর্থনীতি টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারে। অন্যথায়, সামান্য শৈথিল্যও বড় ধরনের সংকট ডেকে আনতে পারে—এ বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের এখনই সচেতন হওয়া জরুরি।