ব্যাংকে খেলাপি ঋণের আগুন! কঠোর পদক্ষেপে নামছে বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দ্রুত বেড়ে চলা খেলাপি ঋণ (নন-পারফর্মিং লোন বা এনপিএল) দমনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে।

বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সদর দফতরে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উপ-গভর্নর ড. মো. কবির আহমেদের নেতৃত্বে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তারা (সিএফও) উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল “দ্য এনপিএল রেজল্যুশন”।

বৈঠকে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়, খেলাপি ঋণ কমাতে নগদ আদায় কার্যক্রম জোরদার করতে এবং দুর্বল ব্যবসাগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে নীতিগত সহায়তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে।

এই কঠোর পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) উদ্বেগ। আইএমএফ বর্তমানে বাংলাদেশের ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় পর্যালোচনা মিশনে আছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বৈঠকে একাধিক ব্যাংক প্রধান জানান, সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত মোট ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশই এখন খেলাপি। বিষয়টি আইএমএফ প্রতিনিধিদলকেও চমকে দিয়েছে। এক এমডি বলেন, “আমাদের বলা হয়েছে ব্যাংকগুলোকে এখন অতিরিক্ত ২০ শতাংশ তহবিল নগদ রিজার্ভ (সিআরআর ও এসএলআর) হিসেবে রাখতে হয়। এতে অর্থনীতিতে প্রবাহিত করার মতো তহবিল অর্ধেকে নেমে এসেছে।”

তিনি আরও জানান, “বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে—যে করেই হোক খেলাপি ঋণ কমাতে হবে, নগদ আদায়ের প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে।”

এদিকে, ব্যাংক নির্বাহীরা প্রস্তাব দিয়েছেন, নীতিগত সহায়তার সময়সীমা বাড়ানোর জন্য। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত যারা খেলাপি হয়েছেন তারাই এই সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু অনেক ঋণগ্রহীতা জুলাইয়ের পরেও খেলাপি হয়েছেন। ব্যাংকগুলো তাই ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে।

এক বেসরকারি ব্যাংকের সিএফও অভিযোগ করেন, “খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। কোনো ইচ্ছাকৃত খেলাপি সহজেই রিট আবেদন করে আদালতের স্থগিতাদেশ পেয়ে যায়, এতে আদায় কার্যক্রম বছরের পর বছর বন্ধ থাকে।”

তিনি প্রস্তাব দেন, “রিট দায়েরের আগে অন্তত ৫ শতাংশ ঋণের টাকা জমা দেওয়াকে বাধ্যতামূলক করা উচিত।”

ব্যাংকগুলো আরও প্রস্তাব করেছে, ঋণ আদালতের সংখ্যা বাড়ানো এবং মামলার নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে আর্থিক খাতের ওপর চাপ কমানো দরকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এখনই সম্ভব না হলে এর প্রভাব গোটা আর্থিক ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। তাই আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই কঠোর নজরদারি, নীতিগত সংস্কার ও আইনি পদক্ষেপ একসাথে নেওয়া হবে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

Leave a Comment