আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় ব্যাংক খাতে ঋণ আদায়ের গতিবেগ হ্রাস পায়। এর ফলে বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়াও ঋণ আদায়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বিশেষভাবে প্রভাবশালী বড় গ্রাহকরা অনেক সময় ঋণ পরিশোধ বন্ধ করে দীর্ঘ মেয়াদে পুনঃতফসিলের আবেদন করে, কখনও কখনও মাত্র অল্প অগ্রিম জমা দেয়।
অন্যান্য ব্যাংকের প্রচলিত নীতি অনুযায়ী সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানোর প্রবণতা থাকলেও ব্যাংক এশিয়া এই পথে সরাসরি এগোয়নি। ব্যাংকটি ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে নগদ প্রবাহের বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন, ঋণগ্রহীতার ঋণ-মূলধন অনুপাত বিশ্লেষণ, নতুন মূলধন সংযোজন এবং জামানত বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে কিছু বড় গ্রাহকের ক্ষেত্রে দর-কষাকষি ও আলোচনার সময় খেলাপি ঋণ সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব দেখা যায় ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে খেলাপি ঋণের হার ১৯ শতাংশে পৌঁছায়। তবে সাহসী কৌশল এবং কার্যকর পদক্ষেপের কারণে বছরের শেষে তা ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে।

ব্যাংক এশিয়ার বহুমুখী কৌশলগুলোর মধ্যে ছিল:
গ্রাহকদের ব্যবসা বিক্রিতে সহায়তা করা
ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি
বন্ধকি ও লিয়েন রাখা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা
উদ্যোক্তাদের মালিকানাধীন জমি ও কোম্পানির শেয়ার বাজেয়াপ্ত করা
এর ফলে ব্যাংকটি বড় সফলতা অর্জন করেছে এবং ২০২৫ সালে পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১,৯১৩ কোটি টাকা।
আর্থিক সূচক (২০২৩–২০২৫)
| বছর | আমানত (কোটি টাকা) | পরিচালন মুনাফা (কোটি টাকা) | খেলাপি ঋণ (%) |
|---|---|---|---|
| ২০২৩ | ৩৩,৭৬৯ | ১,১৫৩ | ৬.৭০ |
| ২০২৪ | ৪১,৬৫৫ | ১,৭০৫ | ১১.৪০ |
| ২০২৫ | ৪৫,৬৪৮ | ১,৯১৩ | ৫.০০ এর নিচে |
ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা প্রায় ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে এবং ঋণ-আমানত অনুপাত ৬০ শতাংশের নিচে রয়েছে, যা তারল্য ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় শক্ত ভিত্তি নির্দেশ করে।
ব্যাংক এশিয়া গ্রাহকদের প্রকল্প বিক্রির মাধ্যমে ঋণ আদায় নিশ্চিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি ও রবিনটেক্স গ্রুপের মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন মূলধন সংযোজন, ঋণ পুনর্গঠন ও আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। এছাড়া স্পিনিং মিলসের প্রধান উদ্যোক্তা শেয়ার হস্তান্তর করেছেন, যা ঋণ আদায়ে সহায়ক হয়েছে।
ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যাংক এশিয়া কঠোর অবস্থান নিয়েছে। চলতি মূলধন অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এবং বিদেশ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। প্রাইম শিপ রিসাইক্লিং, মক্কা মাল্টিলেয়ার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ঋণকে জামানতযুক্ত করা হয়েছে।
ব্যাংক এশিয়ার এমডি সোহেল আর কে হুসেইন জানান, “ঋণ পুনঃতফসিলের পরিবর্তে বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করায় ঋণ আদায় ও মান উন্নত হয়েছে। ব্যাংকের ভিত্তি মজবুত হয়েছে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত হয়েছে। আমরা দেশের দক্ষ ব্যাংকারদের সংযুক্ত করে ব্যাংকটিকে শীর্ষ পর্যায়ের ব্যাংকে রূপান্তর করার উদ্যোগ নিয়েছি।”
সংক্ষেপে, ব্যাংক এশিয়ার উদ্ভাবনী কৌশল, যথাযথ আর্থিক মূল্যায়ন এবং কার্যকর আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
