চট্টগ্রামের চাঞ্চল্যকর বস্তাভর্তি টাকা লুটের মামলায় পূবালী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তাসহ ৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আজ রোববার বিকেলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. মিজানুর রহমান এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মূল হোতাকে যাবজ্জীবন এবং বাকিদের ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার প্রেক্ষাপট ও ঘটনার বিবরণ
২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম নগরে এক নাটকীয় ঘটনার অবতারণা হয়। সেদিন বিকেলে পূবালী ব্যাংকের সিডিএ করপোরেট শাখার জুনিয়র অফিসার (ক্যাশ) রাজিবুর রহমান নগরীর শেখ মুজিব রোড শাখা থেকে ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা একটি বস্তায় ভরে সংগ্রহ করেন। এরপর তিনি তিন নিরাপত্তারক্ষীসহ ব্যাংকের নিজস্ব গাড়িতে করে সীতাকুণ্ড শাখার উদ্দেশে রওনা দেন।
সীতাকুণ্ড শাখা থেকে আরও ৮১ লাখ টাকা সংগ্রহ করার পর তারা পুনরায় সিডিএ করপোরেট শাখার দিকে যাত্রা শুরু করেন। তবে পথিমধ্যে রাজিবুর রহমান রহস্যজনকভাবে কর্তৃপক্ষকে ফোন করে জানান যে, গাড়িতে থাকা টাকার একটি বস্তা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ওই হারানো বস্তাটিতেই ছিল শেখ মুজিব রোড শাখা থেকে তোলা সাড়ে ৫০ লাখ টাকা।
ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ চুরি ছিল না, বরং এর পেছনে ব্যাংকের নিজস্ব লোকবল ও নিরাপত্তারক্ষীদের একটি পরিকল্পিত যোগসাজশ ছিল বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে। ওই রাতেই ব্যাংকের তৎকালীন সহকারী মহাব্যবস্থাপক তৌফিকুর রহমান বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
আদালতের রায় ও দণ্ডপ্রাপ্তদের তালিকা
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর আদালত আজ এই রায় প্রদান করেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী রেজাউল করিম সংবাদমাধ্যমকে রায়ের বিস্তারিত নিশ্চিত করেছেন।
দণ্ডপ্রাপ্তদের বিস্তারিত তথ্য নিচে টেবিল আকারে দেওয়া হলো:
| আসামির নাম | পদের নাম (তৎকালীন) | প্রদত্ত সাজা | জরিমানার পরিমাণ |
| বিজয় কুমার দাশ | সাবেক গাড়িচালক | যাবজ্জীবন কারাদণ্ড | ১০ লাখ টাকা (অনাদায়ে ১০ হাজার টাকা জরিমানা) |
| রাজিবুর রহমান | সাবেক জুনিয়র অফিসার (ক্যাশ) | ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড | ১০ লাখ টাকা (অনাদায়ে আরও ১০ বছর জেল) |
| মো. আশিকুর রহমান | নিরাপত্তারক্ষী | ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড | ১০ লাখ টাকা (অনাদায়ে আরও ১০ বছর জেল) |
| তানজুর রহমান | নিরাপত্তারক্ষী | ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড | ১০ লাখ টাকা (অনাদায়ে আরও ১০ বছর জেল) |
| মাজহারুল ইসলাম | নিরাপত্তারক্ষী | ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড | ১০ লাখ টাকা (অনাদায়ে আরও ১০ বছর জেল) |
বিচারিক কার্যক্রমের সময়রেখা
মামলাটি রুজু হওয়ার পর পুলিশ নিবিড় তদন্ত পরিচালনা করে এবং পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেয়। ২০২২ সালের ১৬ মে আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ শুনানিতে প্রমাণিত হয় যে, আসামিরা পারস্পরিক যোগসাজশে ব্যাংকের গচ্ছিত জনগণের আমানত আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে এই চুরির নাটক সাজিয়েছিলেন।
আজ রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত সকল আসামি আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। রায় পাঠ শেষ হওয়ার পর আদালত আসামিদের সাজা পরোয়ানার মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই রায়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে কর্মরত অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞরা। জনগণের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগের এই বলিষ্ঠ ভূমিকা প্রশংসিত হচ্ছে।
