বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর বর্তমানে এক গভীর আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। উচ্চ খেলাপি ঋণের করাল গ্রাসে ব্যাংকগুলোর মুনাফা অর্জনের সক্ষমতা যেমন কমছে, তেমনি নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণেও দেখা দিয়েছে বিশাল ব্যবধান। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে মোট প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড এক লাখ ৯১ হাজার ৭৮০ কোটি টাকায়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিয়ম এবং ঋণ আদায়ে স্থবিরতার কারণে ব্যাংকগুলো তাদের সম্ভাব্য চার লাখ ৪১ হাজার ৯১ কোটি টাকা মুনাফার বড় অংশই সংরক্ষণ করতে বাধ্য হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রভিশন সংরক্ষণের নিয়ম ও বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাংককে তাদের বিতরণকৃত ঋণের মানের ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে হয়। এটি মূলত আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি প্রক্রিয়া। নিয়মিত বা স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে ০.৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন রাখতে হলেও, মন্দ বা খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে এই হার অনেক বেশি। বিশেষ করে ‘মন্দ ও ক্ষতিকর’ (Bad/Loss) শ্রেণির ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে ১০০ শতাংশ অর্থ আলাদা করে রাখতে হয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
| খাতের নাম | প্রয়োজনীয় প্রভিশন (কোটি টাকা) | সংরক্ষিত প্রভিশন (কোটি টাকা) | ঘাটতি/উদ্বৃত্ত (কোটি টাকা) |
| রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক | – | – | ৭০,৩৬৪.৪৪ (ঘাটতি) |
| বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক | – | – | ১,২১,২১৪.১৯ (ঘাটতি) |
| বিশেষায়িত ব্যাংক | – | – | ২০১.০২ (ঘাটতি) |
| বিদেশি ব্যাংক | – | – | ৩৩৮.০০ (উদ্বৃত্ত) |
| সামগ্রিক ব্যাংক খাত | ৪,৪১,০৯১ | ২,৪৯,৬৪৯ | ১,৯১,৭৮০ (ঘাটতি) |
খেলাপি ঋণের বোঝা ও রাজনৈতিক প্রভাব
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে ব্যাংক খাতে ব্যাপক দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সাল নাগাদ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও গত বছরের শেষ তিন মাসে বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধার কারণে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায় (মোট ঋণের ৩১%) নেমেছে, তবুও এটি সাধারণ অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, বিগত বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধ না করেই নিয়মিত রাখার সুযোগ, নামমাত্র ডাউনপেমেন্টে পুনঃতফসিল এবং ২০১৯ সালের শিথিল নীতিমালার কারণে প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য আড়ালে রাখা হয়েছিল। এখন সেই পুঞ্জীভূত অনিয়মই প্রভিশন ঘাটতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
গবেষণা সংস্থা ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’-এর রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, প্রভিশন ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যখন একটি ব্যাংকের নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে ঘাটতি থাকে, তখন তার নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়, যা বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি করে। বিদেশি ব্যাংকগুলো যেখানে ৩৩৮ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত রাখতে পেরেছে, সেখানে দেশীয় ব্যাংকগুলোর এই বিশাল ঘাটতি তাদের অদক্ষতা ও সুশাসনের অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে।
বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণে ব্যাংকগুলোতে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যথায়, সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা সংকট তৈরি হতে পারে, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে ধসের মুখে ঠেলে দেবে।
