ব্যাঙ্ক কর্মকর্তা থেকে আর্থিক শিকারী: নাফিজ সারাফাতের উত্থান

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এক সময়ের অজানা ব্যাক্তিত্ব Chowdhury Nafeez Sarafat এখন এক গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত নাম। তাঁর উত্থান রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে দেশটির আর্থিক খাতে ব্যাপক দুর্নীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। একসময় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের একজন মধ্যম সারির কর্মকর্তা থেকে শুরু করে আজ তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং বিতর্কিত আর্থিক খেলোয়াড়দের মধ্যে একজন।

শুরুতে তীব্র বিতর্ক

নাফিজ সারাফাতের নাম ২০০৯ সালের পর থেকে সারাদেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। তিনি তার ক্যারিয়ার শুরু করেন ১৯৯৯ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে। কিন্তু কিছুদিন পরেই তিনি IFIC ব্যাংকের স্বাধীন পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান, যা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। একাধিক ব্যাংকে একসাথে দায়িত্ব পালন করা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির পর তিনি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক থেকে পদত্যাগ করেন।

২০০৮ সালে তিনি ICB ইসলামিক ব্যাংকে কনজিউমার ব্যাংকিংয়ের প্রধান হিসেবে যোগ দেন। এর পর পরই তিনি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) থেকে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের লাইসেন্স নেন।

রাজনৈতিক সংযোগ ও বিপুল সমৃদ্ধি

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নাফিজ সারাফাতের উত্থান দ্রুত ত্বরান্বিত হয়। তিনি প্রথমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং পরে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজির আহমেদের সাথে সম্পর্ক মজবুত করেন। শীঘ্রই, তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেন, যেখানে তাকে “চাচা” এবং অর্থমন্ত্রী এএইচএম মোস্তফা কামালকে “কাকা” বলে উল্লেখ করতেন।

নাফিজ সারাফাত তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বিস্তার করেন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে, যা ব্যাংকিং, পুঁজিবাজার, বিদ্যুৎ, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, এবং মিডিয়া খাতে বিস্তৃত ছিল। তাঁর অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য হাজার হাজার কোটি টাকার ছিল বলে জানা গেছে।

পুঁজিবাজারে তার প্রভাব

রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, যার মধ্যে বর্তমানে ১৩টি মিউচ্যুয়াল ফান্ড রয়েছে, তার অন্যতম ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্ম। এটি প্রায়ই তার রাজনৈতিক সংযোগ এবং একাধিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় পরিচালিত হত। ২০১৯ সালের পর, নাফিজ সারাফাতের প্রচেষ্টায় বিভিন্ন মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এক সময় নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে অপ্রত্যাশিতভাবে আরও দশ বছরের জন্য বাড়ানো হয়।

আর্থিক জালিয়াতি ও এক্সপোজার

২০২১ সালে, নাফিজ সারাফাতের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। বিশেষত, কপারটেক ইন্ডাস্ট্রির আইপিও নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়, যেখানে তার লবিংয়ের কারণে আইপিও অনুমোদিত হয়েছিল, যদিও এর পর এটি ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতির কারণে আলোচিত হয়। বাংলাদেশ ফাইনান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) ২০২১ সালে রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেন স্থগিত করে।

কার্টুনিস্টের ওপর হামলা

২০২০ সালের মে মাসে, কার্টুনিস্ট আহমেদ কবীর কিশোর এবং লেখক মুশতাক আহমেদকে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের আওতায় গ্রেপ্তার করা হয়, যারা নাফিজ সারাফাতের ব্যাংক অধিগ্রহণ নিয়ে কার্টুন আঁকেছিলেন। তাদের ওপর ভয়াবহ শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন করা হয়। মুশতাক আহমেদ কারাগারে মারা যান এবং কিশোরকে পরে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।

এ ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ তীব্র প্রতিবাদ জানায়। বিশেষত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, যুক্তরাজ্য, এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন তদন্তের দাবি জানায়।

রাষ্ট্রীয় তদন্ত

এখন, সরকারের পতনের পর, দুর্নীতি দমন কমিশন (ACC) নাফিজ সারাফাতের বিরুদ্ধে তার ব্যাংক অধিগ্রহণ এবং পুঁজিবাজারে আর্থিক তছরুপের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং তদন্তের ফলে একটি বৃহত্তর দুর্নীতির নেটওয়ার্কের উন্মোচন হতে পারে, যা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল।

উপসংহার

বাংলাদেশের আর্থিক খাতে নাফিজ সারাফাতের মতো ব্যক্তির উত্থান এবং তার সাথে জড়িত দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার একটি চিত্র তুলে ধরে। তার কার্যকলাপের উপর ভবিষ্যতের তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক চাপের ফলাফল বাংলাদেশে আর্থিক নীতি এবং দুর্নীতির প্রতি জনগণের সচেতনতা বাড়াতে পারে।

Leave a Comment