মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধি সম্ভব

মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশে দারিদ্র্যর হার বাড়ার সম্ভাবনা জোরালো করছে। বিশ্বব্যাংকের “বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট” (এপ্রিল ২০২৬ সংস্করণ) অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে প্রায় ১২ লাখ মানুষ নতুনভাবে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন মজুরি এবং কর্মসংস্থানের ধীরগতি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

বর্তমানে কোনো কর্মক্ষম ব্যক্তি দিনে তিন ডলারের কম আয় করলে তাকে দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১.৪ শতাংশে। গত বছর নতুনভাবে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছেন। পূর্বে ধারণা করা হয়েছিল, ২০২৬ সালে ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠবেন, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে তা মাত্র ৫ লাখে সীমিত থাকবে। অর্থাৎ, প্রায় ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হতে পারেন।

বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান) জ্যঁ পেম বলেন, “বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় ব্যাহত হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের কারণে বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদী দারিদ্র্য হ্রাসের ধারাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শোভন কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করা অত্যন্ত জরুরি।”

বিশ্বব্যাংক ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, যদি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ না হতো, তবে ২০২৮ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার কমে ১৯.৩ শতাংশে নেমে আসতে পারত। তবে বর্তমান পরিস্থিতি তা সম্ভব করছে না।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বাংলাদেশের অন্তত ছয়টি খাতে প্রভাব ফেলতে পারে। সেগুলো নিম্নে টেবিলে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

খাতপ্রভাবের ধরন
হিসাবের ভারসাম্যআমদানি-রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও টাকার অবমূল্যায়নে নেতিবাচক প্রভাব
জিডিপি বৃদ্ধিভোগব্যয় ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব, প্রবৃদ্ধিতে চাপ
মূল্যস্ফীতিজ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহনের খরচ বেড়ে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি
দারিদ্র্য১২ লাখ নতুন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারেন
আর্থিক চাপসার, জ্বালানি ও ভর্তুকি খরচ বৃদ্ধি, বাজেটের উপর চাপ
বৈষম্যগিনি সূচক ০.২ শতাংশ বৃদ্ধি, আয়ের বৈষম্য বাড়ার সম্ভাবনা

বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, “উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সীমিত মজুরি বৃদ্ধির কারণে দারিদ্র্য কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারকে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার অব্যাহত রাখতে হবে।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য টার্গেটভিত্তিক সহায়তা প্রদান অত্যন্ত জরুরি। এতে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট আর্থিক চাপে কিছুটা প্রশমন আনা সম্ভব হবে।

সারসংক্ষেপে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও শ্রমবাজারের সংকট একত্রে বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। চলতি বছর প্রায় ১২ লাখ মানুষ নতুনভাবে দরিদ্র হতে পারেন, যা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিমালা পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করছে।

Leave a Comment