বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ১২ জন গভর্নর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে কম সময় দায়িত্ব পালন করেছেন ড. আহসান এইচ মনসুর, যিনি মাত্র ১ বছর ৬ মাস ১৭ দিন দায়িত্বে ছিলেন। স্বল্প সময় দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর সময়কালে নেওয়া বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
সরকার তাঁকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আড়াই বছর আগেই পদ থেকে সরিয়ে দেয়। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁর কিছু সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশ্ন ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, অতীতে সিএসআর তহবিল মূলত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ব্যয় করা হতো। কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন, স্বাস্থ্য ক্যাম্প এবং অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজে এই তহবিল ব্যবহার করা হতো। তবে আহসান এইচ মনসুরের দায়িত্বকালে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তহবিল থেকে অনুদান পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিচের টেবিলে মনসুরের দায়িত্বকাল এবং বিতর্কিত সিএসআর বরাদ্দের কিছু উদাহরণ দেখানো হলো:
| প্রতিষ্ঠান/প্রকল্প | অনুদান অর্থ (টাকা) | লক্ষ্য/প্রয়োজনীয়তা | বিতর্কের কারণ |
|---|---|---|---|
| খলিল-মালিক ফাউন্ডেশন, চুয়াডাঙ্গা | 2 কোটি 97 লাখ | ক্যানসার ও কিডনি রোগীদের সহায়তা | গভর্নরের ঘনিষ্ঠ পরিচিতি; সময়মতো সক্ষমতা যাচাই হয়নি |
| চুয়াডাঙ্গা উচ্চবিদ্যালয় কম্পিউটার ল্যাব | 25 লাখ | শিক্ষার উন্নয়ন | গভর্নরের সরাসরি উপস্থিতি ও উদ্বোধন |
| মার্থা লিন্ডস্ট্রম নূরজাহান বেগম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, টাঙ্গাইল | 25 লাখ | শিক্ষার উন্নয়ন | গভর্নর প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি; স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ |
| নীলফামারী সরকারি উচ্চবিদ্যালয় | অজানা | শিক্ষার উন্নয়ন | গভর্নরের শৈশবের বিদ্যালয়; বিভাগে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ |
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, সিএসআর তহবিলের বরাদ্দে গভর্নরের সরাসরি সম্পৃক্ততা বিরল। আহসান এইচ মনসুরের সময়ে এই তহবিল থেকে অনুদান দেওয়া ঘটনা ব্যাংকের ভিতরে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের বিদ্যালয় ও গভর্নরের মালিকানাধীন ওয়াটার গার্ডেন রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা সংলগ্ন এলাকাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, সিএসআর তহবিল বরাদ্দে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোনো গভর্নরের ব্যক্তিগতভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দেওয়া স্বার্থের সংঘাতের বিষয় এবং এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মবিরুদ্ধ। অন্য কোনো গভর্নরের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে ওঠেনি।
এই বিতর্ক বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল তহবিল ব্যবস্থাপনার ওপর নতুন প্রশ্ন তুলেছে, যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব আগে থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
