মানুষের হাতে নগদ টাকা বৃদ্ধি, শঙ্কা তারল্য সংকটের

দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে সাধারণ মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের জন্য একটি নেতিবাচক সংকেত। অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর গ্রাহকদের আস্থার সংকট এই পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ। গ্রাহকদের এই অর্থ উত্তোলনের ধারা যদি অব্যাহত থাকে এবং উত্তোলিত অর্থ পুনরায় ব্যাংকিং চ্যানেলে ফিরে না আসে, তবে আগামীতে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান ও নগদ অর্থ বৃদ্ধির চিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য ও প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংকের বাইরে থাকা মুদ্রার পরিমাণ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকা। এর চার মাস আগে, অর্থাৎ গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৭ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা। তারও আগে, গত বছরের নভেম্বর মাসে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ষণ্নব্বই হাজার ১৮ কোটি টাকা।

细分 মাসভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চ মাসে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে নগদ অর্থ বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ ছিল ২ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা, যা জানুয়ারিতে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে এই স্থিতি আরও বৃদ্ধি পেয়ে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা হয় এবং সর্বশেষ মার্চে তা ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকায় পৌঁছায়।

ব্যাংকের বাইরে থাকা মুদ্রার সংজ্ঞা ও কারণ বিশ্লেষণ

অর্থনীতিতে ‘ব্যাংকের বাইরে থাকা মুদ্রা’ বলতে মূলত সেই অর্থকে বোঝায়, যা গ্রাহকরা তাদের bank হিসাব থেকে উত্তোলন করার পর পুনরায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত হিসেবে ফেরত জমা করেন না। এই অর্থ বাজারে সাধারণ লেনদেনে ব্যবহৃত হলেও ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদান সক্ষমতা এবং আমানতের হিসাবের বাইরে থাকে। ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, মূলত তিনটি প্রধান কারণে মানুষের হাতে নগদ অর্থ রাখার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে—চলমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকের প্রতি আস্থাহীনতা। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রবণতা বজায় থাকলে তা ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি পরিচালনায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এই বিষয়ে অর্থনীতিবিদ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েティブের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি জানান, সাধারণত দুটি বিশেষ কারণে মানুষ ব্যাংক থেকে অধিক পরিমাণে টাকা তুলে নিজেদের কাছে রাখে। প্রথমত, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে সাধারণ মানুষকে বেশি পরিমাণে নগদ অর্থ হাতে রাখতে হয়। দ্বিতীয়ত, কিছু ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম বা সংকটের কারণে আস্থার অভাব তৈরি হলে গ্রাহকরা তাদের সঞ্চিত অর্থ তুলে নেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল হলে এই অর্থ হয় অন্য কোনো ভালো ব্যাংকে জমা হবে, না হয় আগের ব্যাংকেই আবার ফিরে আসবে।

রিজার্ভ মানি বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব

ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বৃদ্ধির সমান্তরালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উৎপাদিত বা ছাপানো টাকা, যা ‘রিজার্ভ মানি’ নামে পরিচিত, তার পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে রিজার্ভ মানির স্থিতি ছিল ৪ লাখ ২৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। মার্চ মাস শেষে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৩ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ মানি বৃদ্ধি পেয়েছে ১৮ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে মোট মুদ্রা সরবরাহ এবং মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ—এই দুটি সূচক যদি একই সাথে ঊর্ধ্বমুখী থাকে, তবে তা দেশের বিদ্যমান মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

আস্থার সংকট ও সাম্প্রতিক প্রবণতার পরিবর্তন

বাংলাদেশ ব্যাংকের অতীত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ রাখার প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। ওই সময়ে ব্যাংক খাতের বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি এবং তারল্য সংকট সংক্রান্ত খবরের কারণে উদ্বেলিত হয়ে অনেক গ্রাহক ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিজেদের বাসায় সংরক্ষণ শুরু করেছিলেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটার পর ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থা কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়। এর ফলে ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত টানা canছয় মাস ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করেছিল।

তবে চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে এই ইতিবাচক পরিস্থিতি আবার বিপরীত দিকে মোড় নিতে শুরু করেছে। মার্চ মাসে ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের আর্থিক খাতের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানিয়ে অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, মানুষ যদি ধারাবাহিকভাবে ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন করতে থাকে এবং সেই অর্থ দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়, তবে তা পুরো অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই সার্বিক তারল্য পরিস্থিতির ওপর সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের নিবিড় নজরদারি বজায় রাখা প্রয়োজন।

Leave a Comment