রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কাগুজে মুনাফা: ডেফারেল সুবিধায় আড়াল হচ্ছে লোকসান

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির মধ্যে পড়েছে, যা ২০১৫ সালের পর আরও বৃদ্ধি পায়। বিশেষত ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা নানা প্রভাব খাটিয়ে এসব ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নেন। ফলে, এই ব্যাংকগুলো প্রতি বছরই লোকসানে পড়ে, তবে এর সব কিছু ‘ডেফারেল’ নামক এক বিশেষ সুবিধা দিয়ে আড়াল করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংক একযোগে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা গ্রহণ করেছে। এই সুবিধার মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রকৃত লোকসান গোপন করে কাগজে মুনাফা দেখাতে সক্ষম হয়। ডেফারেল সুবিধা, মূলত একটি ধরনের অস্থায়ী সুবিধা, যা ব্যাংকগুলোকে তাদের প্রভিশন (ঋণ সংক্রান্ত প্রক্ষেপণ) এবং বিলম্বিত কর সংক্রান্ত দায় মেটাতে সহায়তা করে। এর ফলে ব্যাংকগুলো ঋণের বিপরীতে প্রভিশন না রেখে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব ব্যাংকের মোট ডেফারেল দায় দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৮৬ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতির বিপরীতে এবং ৩ হাজার ৩২১ কোটি টাকা সম্পদের বিলম্বিত করের বিপরীতে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এ ব্যাংকগুলো কার্যত লোকসানে থাকলেও হিসাবের খাতায় মুনাফা দেখাচ্ছে।

বিশেষ সুবিধা নেওয়ার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে জনতা ব্যাংক, যা এককভাবে ৪৬ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা নিয়েছে। এর মধ্যে ৪৬ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতিতে এবং ৬৭৮ কোটি টাকা সম্পদের বিলম্বিত করের বিপরীতে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক, যার ডেফারেল সুবিধার পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে রূপালী ব্যাংক, যা ১৩ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকার সুবিধা গ্রহণ করেছে।

এর পাশাপাশি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণও বিপুল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে এ ছয় ব্যাংকের মোট ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ রয়েছে জনতা ব্যাংকের, যার পরিমাণ ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এ ডেফারেল সুবিধা বাস্তবে এক ধরনের “অর্থনৈতিক কসমেটিক” ব্যবস্থা। এটি কিছু সময়ের জন্য প্রকৃত লোকসান আড়াল করতে সক্ষম হলেও, ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়।

গবেষক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি বলছেন, এই সুবিধা মূলত রাজনৈতিক চাপের ফল। তিনি উল্লেখ করেন, “রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর লোকসান দেখালে সরকারের আর্থিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই এটি কাগজে লাভ দেখানোর একটি পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যাংক খাতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।”

তিনি আরও বলেন, “এখনই ডেফারেল সুবিধা বন্ধ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি, অদক্ষ পরিচালনা পর্ষদ ও রাজনৈতিক নিয়োগ বন্ধ করে পেশাদার ব্যাংকারদের নেতৃত্বে ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। যদি এ কাগুজে লাভের সংস্কৃতি বন্ধ না করা যায়, তবে কয়েক বছরের মধ্যেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কার্যত দেউলিয়া হয়ে পড়বে।”

এভাবে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক অনিয়ম এবং ডেফারেল সুবিধার মাধ্যমে কৃত্রিম মুনাফা দেখানো দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

Leave a Comment