বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের আর্থিক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি ব্যাংককে একীভূত করে মাত্র দুটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মঙ্গলবার ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় এই প্রস্তাব তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ব্যাংকিং খাতে সুশাসন জোরদার করা, আর্থিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্বলতা দূর করা।
গভর্নর বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় দেশে ব্যাংকের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি। বর্তমানে দেশে তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা একষট্টি, যা নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দশ থেকে পনেরোটি শক্তিশালী ও পর্যাপ্ত মূলধনসম্পন্ন ব্যাংকই যথেষ্ট। ছোট ও দুর্বল ব্যাংকের আধিক্য সুশাসনের অভাব সৃষ্টি করেছে এবং আর্থিক অস্থিরতাকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
আন্তর্জাতিক তুলনা টেনে গভর্নর উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের তুলনায় দশগুণেরও বেশি বড় অর্থনীতি থাকা সত্ত্বেও ভারত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে কয়েকটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে সীমিত রেখেছে। একইভাবে সিঙ্গাপুরের একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের সম্পদের পরিমাণই বাংলাদেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের সম্মিলিত সম্পদের কাছাকাছি। এসব উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, অল্পসংখ্যক বড় ব্যাংক পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলকভাবে সহজ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও কার্যকর হয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি ব্যাংকের কাঠামো বর্তমানে বাণিজ্যিক, উন্নয়নমূলক ও বিশেষায়িত—এই তিন ভাগে বিভক্ত। প্রস্তাবিত একীভূতকরণে এসব ব্যাংককে দুটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের আওতায় আনার কথা ভাবা হচ্ছে।
| শ্রেণি | ব্যাংকের নাম |
|---|---|
| বাণিজ্যিক | সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক |
| উন্নয়নমূলক | বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ উন্নয়ন ব্যাংক |
| বিশেষায়িত | বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক |
এই পরিকল্পনা আর্থিক খাতের বৃহত্তর সংস্কার কর্মসূচির অংশ। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েকটি দুর্বল বেসরকারি ইসলামি ব্যাংক একীভূত করেছে এবং একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসান প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গভর্নরের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে ব্যাংকিং খাতে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে, যার একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে মনে করছেন। তাঁদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে بيرোক্র্যাটিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হওয়ায় দক্ষতা ও জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতীতে বড় অঙ্কের ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে এসব ব্যাংকের সম্পৃক্ততা ছিল, যার দায় শেষ পর্যন্ত সরকার ও করদাতাদের ওপরই পড়েছে। একাধিকবার পুনঃমূলধন জোগান দিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সরকারের আর্থিক সহায়তার পরিমাণ পঁচিশ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তবুও খেলাপি ঋণের হার কয়েকটি ব্যাংকে উদ্বেগজনকভাবে বেশি রয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, একীভূতকরণই ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফেরানো, আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
