রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন: অর্থবছর শেষে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের হাতছানি

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে একটি শক্তিশালী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার সুফল মিলছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হারে। গত সোমবার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) আয়োজিত এক সেমিনারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দেশের অর্থনীতির এই ইতিবাচক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তি ছাড়াই চলতি অর্থবছর শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করবে, এমনকি তা অতিক্রমও করতে পারে।

রিজার্ভ ও মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা

গভর্নরের মতে, বর্তমানে বৈদেশিক খাত ও ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের ক্ষেত্রে স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিনিময় হার স্থিতিশীল হওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন নিজেরাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো বিশেষ শর্ত ছাড়াই বাজার থেকে ইতোমধ্যে ৩.৭ বিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছে, যা আইএমএফ-এর সহায়তার চেয়েও বেশি। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাজারে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন টাকার নতুন তারল্য সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে।

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান গতিপ্রবাহ ও লক্ষ্যমাত্রা:

অর্থনৈতিক সূচকবর্তমান অবস্থা / অর্জনভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভক্রমবর্ধমান ও স্থিতিশীল৩৫ বিলিয়ন ডলার + (অর্থবছর শেষে)
ডলার ক্রয় (বাজার থেকে)৩.৭ বিলিয়ন ডলারতারল্য সংকট নিরসন ও রিজার্ভ গঠন
আমানত প্রবৃদ্ধি (Deposit)১১ শতাংশ (ডিসেম্বর পর্যন্ত)১৪ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা
মোট আমানতপ্রায় ২০ ট্রিলিয়ন টাকাবেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি
মুদ্রাস্ফীতি (Inflation)৮ শতাংশের উপরে৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা
ঋণের সুদহার১১-১২ শতাংশের মধ্যেনীতি সুদহার কমিয়ে আরও হ্রাস করা

তারল্য বৃদ্ধি ও বেসরকারি খাতে অর্থায়ন

ব্যাংকিং খাতে আমানতকারীদের আস্থা ফিরে আসার বিষয়টি উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, গত ডিসেম্বর মাসে আমানত বৃদ্ধির হার ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আমানত প্রবৃদ্ধি ১৪ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি সম্ভব হলে বেসরকারি খাতে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন টাকা বাড়তি অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অর্থ কোনো নতুন টাকা ছাপিয়ে নয়, বরং ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের উদ্বৃত্ত থেকে আসবে, যা অর্থনীতির জন্য ‘অক্সিজেন’ হিসেবে কাজ করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুদের হার কমাতে সাহায্য করবে।

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

মুদ্রাস্ফীতি বর্তমানে ৮ শতাংশের উপরে থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য একে ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। আহসান এইচ মনসুর জানান, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলে এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলে নীতি সুদহার কমানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। ইতোমধ্যে প্রধান গ্রাহকদের জন্য ঋণের সুদহার প্রায় ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ১১-১২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা শিল্পায়নের জন্য ইতিবাচক।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও তথ্যের গুরুত্ব

সেমিনারে ডেপুটি ব্রিটিশ হাইকমিশনার জেমস গোল্ডম্যান টেকসই উন্নয়নের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ উল্লেখ করেন যে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তথ্যের বিশাল ভাণ্ডার বা ‘ডেটার স্বর্ণখনি’ থাকলেও সেগুলো নিয়মিত ও সময়মতো প্রকাশ করা প্রয়োজন। সঠিক সময়ে নির্ভুল তথ্যের প্রাপ্যতা নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও ফলপ্রসূ করবে।

উপসংহারে বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক খাতের এই শৃঙ্খলা বজায় থাকলে চলতি অর্থবছরেই দেশ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে সক্ষম হবে।

Leave a Comment