বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসায় এখন দেশের করপোরেট খাতকে বিদেশে বিনিয়োগে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের করপোরেট পতাকা উড়তে দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে জানান, শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি ছাড়া টেকসই বৈদেশিক সম্প্রসারণ সম্ভব নয়, আর সেই ভিত্তি এখন ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে।
সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ ও মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। গভর্নর জানান, কিছুদিন আগেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি সংকটজনক পর্যায়ে ছিল, তবে সাম্প্রতিক নীতি সহায়তা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ফলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং চলতি বছরের জুন নাগাদ তা ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ডিসেম্বর মাসে আমদানি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা অর্থনীতির চাহিদা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের ওপর যে চাপ ছিল, তা অনেকটাই কমে এসেছে। ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতিও উন্নত হয়েছে; ২০২৫ সালে ব্যাংক আমানত প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলো এখন ভালো ও যোগ্য গ্রাহকদের ঋণ দিতে উৎসাহিত হবে, যা সুদের হার প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে গভর্নর আশা প্রকাশ করেন।
ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, এ ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব করা হয়নি। গাজী গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ ও মন্নো সিরামিকসসহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর আবেদন একই নীতির আওতায় বিবেচনা করা হয়েছে। তার ভাষায়, “যেখানে ব্যবসায়িক সম্ভাবনা থাকবে, সেখানেই সহায়তা দেওয়া হবে।”
সেমিনারে ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার জেমস গোল্ডম্যান বলেন, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের সঙ্গে বিনিয়োগ অংশীদারিত্ব জোরদার করতে আগ্রহী। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের রপ্তানিপণ্যের জন্য যুক্তরাজ্যের শুল্ক সুবিধা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে, যা রপ্তানিকারকদের জন্য বড় সুযোগ সৃষ্টি করছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ বলেন, নীতিনির্ধারণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী তথ্যের প্রাপ্যতা। এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন। সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান ও নূরুন নাহার।
আলোচনায় মাসিক পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্সের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়, যা এমসিসিআই যুক্তরাজ্যের সহায়তায় নিয়মিত প্রকাশ করে। ডিসেম্বর মাসে এই সূচক ৫৪ দশমিক ২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়। কৃষি ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি থাকলেও উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে সামান্য মন্থরতা লক্ষ্য করা গেছে।
নির্বাচিত অর্থনৈতিক সূচক (ডিসেম্বর)
| সূচক | অবস্থা |
|---|---|
| বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ | ৩৩ বিলিয়ন ডলার |
| জুন লক্ষ্য | ৩৫ বিলিয়ন ডলার |
| আমদানি প্রবৃদ্ধি | ৬ শতাংশ |
| ব্যাংক আমানত বৃদ্ধি | ২.২ ট্রিলিয়ন টাকা |
| পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স | ৫৪.২ পয়েন্ট |
বিশ্লেষকদের মতে, রিজার্ভ ও ব্যাংকিং তারল্য শক্তিশালী হলে বিদেশে বিনিয়োগের পথ আরও সুগম হবে এবং তা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের করপোরেট খাতকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নেবে।
