রেকর্ড উন্নয়ন কর্মসূচি অনুমোদন

আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় তিন লাখ আট হাজার কোটি টাকার রেকর্ড পরিমাণ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশের সার্বিক উন্নয়ন কৌশল, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমান।

পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন উন্নয়ন কর্মসূচির মোট আকার তিন লাখ আট হাজার কোটি টাকারও বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে প্রায় এক লাখ নব্বই হাজার কোটি টাকা জোগান দেওয়া হবে। বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে প্রায় এক লাখ দশ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে প্রায় আট হাজার নয়শ কোটি টাকা যুক্ত হবে।

এই উন্নয়ন পরিকল্পনাটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত কাঠামোর ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, বৈষম্যহীন উন্নয়ন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, আঞ্চলিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংহতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামোর আধুনিকায়ন, বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধিও এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রধান খাতভিত্তিক বরাদ্দ

নতুন কর্মসূচিতে সর্বাধিক বরাদ্দ পেয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এরপর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা খাতে উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নিচে প্রধান খাতভিত্তিক বরাদ্দ উপস্থাপন করা হলো—

খাতের নামবরাদ্দ (কোটি টাকা)
পরিবহন ও যোগাযোগ৫০,০৯২
শিক্ষা৪৭,৫৯১
স্বাস্থ্য৩৫,৫৩৫
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি৩২,৬৯১
গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা২০,৩৬১

মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দ ও বিশেষ দিক

স্থানীয় সরকার বিভাগ এবার সর্বাধিক বরাদ্দ পেয়েছে, যার পরিমাণ তেত্রিশ হাজার সাতশ কোটি টাকারও বেশি। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ পেয়েছে প্রায় ত্রিশ হাজার সাতশ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগও বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ পেয়েছে।

এবারের উন্নয়ন কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো থোক বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিশেষ সহায়তা খাতে প্রায় এক লাখ আঠারো হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই ধরনের বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা রয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষা খাতে গুরুত্ব

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে এবার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবার কার্ড কর্মসূচির জন্য এক হাজার চারশ কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কৃষক কার্ড কর্মসূচির জন্যও একই পরিমাণ অর্থ নির্ধারণ করা হয়েছে। ধর্মীয় উপাসনালয়ে দায়িত্ব পালনকারীদের সম্মানী বাবদ এক হাজার একশ কোটি টাকারও বেশি অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোকে আরও বিস্তৃত করবে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন ও চ্যালেঞ্জ

নতুন উন্নয়ন কর্মসূচিতে এক হাজার একশরও বেশি উন্নয়ন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ প্রকল্প, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার উদ্যোগ। পাশাপাশি আরও এক হাজারের বেশি প্রকল্প পরবর্তী পর্যায়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

তবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার প্রায় ছত্রিশ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে কম। বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং প্রকল্প সময়মতো শেষ করার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

বৈঠকে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সরকারের প্রত্যাশা, এই বৃহৎ উন্নয়ন কর্মসূচি দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Leave a Comment