বিশ্বজুড়ে এক কোটিরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশির অবস্থান দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু পারিবারিক ব্যয় মেটানোর মাধ্যম নয়, বরং জাতীয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতেও বড় ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বাজারের পরিবর্তনের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার প্রতিদিনই অর্থনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার মূলত চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। দেশে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ে, ফলে স্থানীয় মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়লে বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি পায় এবং কিছুটা স্থিতিশীলতা তৈরি হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য পরিবর্তন, বৈশ্বিক সুদের হার, ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কাও বিনিময় হারের ওঠানামায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।
রোববার (২৪ মে) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার ক্রয় ও বিক্রয় হার নিচে তুলে ধরা হলো—
আজকের মুদ্রা বিনিময় হার (২৪ মে)
| মুদ্রার নাম | ক্রয় মূল্য (টাকা) | বিক্রয় মূল্য (টাকা) |
|---|---|---|
| মার্কিন ডলার | ১২২.১৫ | ১২৩.১৫ |
| ইউরোপীয় ইউরো | ১৩৯.৮৯ | ১৪৪.৭৫ |
| ব্রিটিশ পাউন্ড | ১৬২.১৮ | ১৬৭.২৯ |
| জাপানি ইয়েন | ০.৭৬ | ০.৭৮ |
| সিঙ্গাপুর ডলার | ৯৫.০৩ | ৯৬.৬৩ |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত দিরহাম | ৩৩.২৫ | ৩৩.৫৪ |
| অস্ট্রেলীয় ডলার | ৮৬.৪১ | ৮৮.৪২ |
| সুইস ফ্রাঁ | ১৫৪.১৭ | ১৫৮.৩৫ |
| সৌদি রিয়াল | ৩২.৫৩ | ৩২.৮৪ |
| চীনা ইউয়ান | ১৭.৮৭ | ১৮.২৩ |
| ভারতীয় রুপি | ১.২৭ | ১.২৯ |
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা থেকে। ফলে এসব অঞ্চলের মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তন সরাসরি প্রবাসী আয়ের স্থানীয় মূল্যে প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে মার্কিন ডলার ও সৌদি রিয়ালের ওঠানামা হলে দেশের রেমিট্যান্স আয়ের সামগ্রিক প্রবাহে তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা যায়।
আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার প্রতিদিনই পরিবর্তনশীল। আমদানি চাহিদা বেড়ে গেলে ডলারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়লে বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়ে কিছুটা ভারসাম্য ফিরে আসে। এই ওঠানামার কারণে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আমদানি ব্যয় নির্ধারণ এবং রপ্তানি কৌশল প্রণয়নে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অর্থনীতিবিদরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের ওপর জোর দিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং আমদানি ব্যয়ের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ। পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সময়োপযোগী আর্থিক নীতি গ্রহণ করাও অত্যন্ত জরুরি বলে তারা মত দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেকোনো সময় এই বিনিময় হারে পরিবর্তন আনতে পারে। তাই সাধারণ গ্রাহক, প্রবাসী পরিবার, ব্যবসায়ী এবং আমদানিকারকদের জন্য নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য জানা এবং সে অনুযায়ী আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
