দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ আরও তীব্রতর হয়েছে। দীর্ঘ ৯ মাস পর জাতীয় পর্যায়ে গড় মূল্যস্ফীতি আবারও ৯ শতাংশের ঘর অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে। এর আগে গত বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিম্নমুখী হওয়ার আভাস পাওয়া গেলেও ফেব্রুয়ারি মাসের এই উল্লম্ফন সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
খাদ্য ও খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি
বিবিএসের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মূলত খাদ্যপণ্যের আকাশচুম্বী দামই সার্বিক মূল্যস্ফীতিকে এই পর্যায়ে নিয়ে গেছে। জানুয়ারিতে যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ফেব্রুয়ারিতে তা এক লাফে বেড়ে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে কাঁচাবাজারের অস্থিরতা এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে খাদ্য-বহির্ভূত খাতেও। পোশাক-আশাক, গৃহস্থালি সামগ্রী, আবাসন, পরিবহন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতেও ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। জানুয়ারি মাসে খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ, যা ফেব্রুয়ারি মাসে ৯ দশমিক ০১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে গত কয়েক মাসের মূল্যস্ফীতির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
সাম্প্রতিক সময়ের মূল্যস্ফীতির তুলনামূলক চিত্র
| মাস ও বছর | সার্বিক মূল্যস্ফীতি (%) | খাদ্য মূল্যস্ফীতি (%) | খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি (%) |
| এপ্রিল ২০২৩ | ৯.১৭ | ৯.১০ | ৯.২৫ |
| মে ২০২৩ | ৯.০৫ | ৮.৮৫ | ৯.২০ |
| জানুয়ারি ২০২৬ | ৮.৫৮ | ৮.২৯ | ৮.৮১ |
| ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৯.১৩ | ৯.৩০ | ৯.০১ |
অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট ও মুদ্রানীতি
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। অর্থাৎ বাজারে অর্থের সরবরাহ কমিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সরকারের এই উদ্যোগের বিপরীতে গত বছরের বেশিরভাগ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়েই ছিল। ১২ মাসের গড় হিসেবে জানুয়ারি মাসেও মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে ডলারের সংকট ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এই মূল্যস্ফীতির পেছনে জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে রমজান মাসকে সামনে রেখে সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের মজুতদারির কারণেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
জনজীবনে এর প্রভাব ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার অর্থ হলো—গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যে পণ্যটি কিনতে ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, এখন তার জন্য ব্যয় করতে হচ্ছে ১০৯ টাকার বেশি। মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, ব্যয়ের গতি তার চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষের সঞ্চয় কমে যাচ্ছে এবং অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যারা স্বল্প আয়ের মানুষ, তাদের প্রাত্যহিক খাদ্য তালিকার অনেক পদ কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রি এবং কঠোর বাজার মনিটরিংয়ের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার সুফল খুব একটা দৃশ্যমান হচ্ছে না। আগামী মাসগুলোতে যদি খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হয় এবং আমদানিনির্ভর পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
