লুৎফর রহমান সরকার: বাংলাদেশের বিপ্লবী ব্যাংকার

আজ, ১ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসের এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব লুৎফর রহমান সরকারের ৯৩তম জন্মবার্ষিকী। তিনি কেবল একজন দক্ষ ব্যাংকারই ছিলেন না, বরং সমাজকল্যাণের জন্য নিবেদিত একটি দৃষ্টি সম্পন্ন সংস্কারক, ন্যায়পরায়ণতা রক্ষাকারী এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে আত্মনিবেদিত নেতা ছিলেন।

১৯৩৪ সালে বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার আমরুল ইউনিয়নের ফুলকোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সরকার। তিনি সততা, সাহস এবং উদ্ভাবনী চিন্তার প্রতীক ছিলেন। তার ব্যাংকিং দর্শনের মূলমন্ত্র ছিল—“আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেবল ধনীদের মসৃণ করে চলেছে; বরং এটি দরিদ্রদের ক্ষমতায়ন করতে হবে।” এই বিশ্বাসের আলোকে তিনি শিক্ষাজীবী ও যুবসমাজকে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

সরকারের কর্মজীবন বহুমুখী। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য “বিকল্প” কর্মসংস্থান প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। এছাড়া তিনি ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং বিষয়ে পার্ট-টাইম লেকচারার, সাহিত্যিক, এবং জাতীয় কবিতা পরিষদের সহ-প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন।

তার উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচি নিম্নলিখিতভাবে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

বছরমাইলস্টোনপ্রতিষ্ঠান/প্রকল্পভূমিকা ও অবদান
১৯৩৪জন্মফুলকোট, বগুড়া
১৯৫৫এমএ (রাজনীতি)ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়স্নাতক
১৯৫৫–১৯৬০প্রারম্ভিক কর্মজীবনরেডিও পাকিস্তান ও বিভিন্ন ব্যাংকব্যাংকিং ও প্রশাসন
১৯৮০-এর দশকবিশ্ববিদ্যালয় কর্মসংস্থান প্রকল্প “বিকল্প”সোনালী ব্যাংকপ্রতিষ্ঠাতা ও উদ্ভাবক
১৯৯৬–১৯৯৮গভর্নরবাংলাদেশ ব্যাংকসংস্কার ও জনকল্যাণ নীতি উন্নয়ন
২০১৩মৃত্যুঅ্যাপোলো হাসপাতাল, ঢাকাবয়স ৮০ বছর

তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা ঋণ, ক্ষুদ্র উদ্যোগীদের জন্য কালেক্টরাল-ফ্রি মাইক্রোলোন, এবং বিভিন্ন অংশ-সময়ের কর্মসূচির মাধ্যমে হাজার হাজার বেকার স্নাতককে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলেন। এই উদ্যোগগুলো বাংলাদেশে বর্তমান ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (SME) এবং শিক্ষার্থীদের ঋণ ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছে।

সাহসী ব্যক্তিত্বের জন্য তিনি সামরিক শাসনের সময় স্বীয় নামে প্রকল্প রাখার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সাময়িকভাবে কারাবন্দি হন; কিন্তু ছাত্র আন্দোলনের কারণে মুক্তি পান। তিনি দুর্নীতি প্রতিরোধে এবং জনকল্যাণমূলক নীতির জন্য সবসময় নিরলস কাজ করেছেন।

ব্যাংকিংয়ের বাইরে তিনি সাহিত্য, সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। আধুনিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ও দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী তৈরিতে তার সহায়তা যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে।

২৪ জুন ২০১৩ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন লুৎফর রহমান সরকার। তবে তার মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়পরায়ণ ব্যাংকিং দর্শন আজও বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও সমাজকল্যাণ খাতে প্রেরণার উৎস হিসেবে বিদ্যমান। তিনি সত্যিই বাংলাদেশের “বিপ্লবী ব্যাংকার”, যার দৃষ্টান্ত আগামী প্রজন্মের ব্যাংকার, সংস্কারক ও নাগরিকদের পথপ্রদর্শক।

Leave a Comment