দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও গতিশীল, শিল্প উৎপাদনকে সম্প্রসারিত এবং রপ্তানি সক্ষমতাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ নীতি-প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তাঁরা এসব প্রস্তাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সামনে তুলে ধরেন। বৈঠকে দেশের বৃহৎ দুই ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন, যাদের মধ্যে ছিলেন এফবিসিসিআই এবং বিজিএমইএ-এর শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা।
ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, বর্তমান সময়ে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার শিল্প খাতের জন্য বড় একটি প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী খাতগুলো এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছে। তাঁদের মতে, সুদের হার ধাপে ধাপে এক অঙ্কে নামিয়ে আনা গেলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়বে, নতুন শিল্প স্থাপন সহজ হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ত্বরান্বিত হবে।
বৈঠকে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, এক সময় এই তহবিলের আকার প্রায় সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলার থাকলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় দুই দশমিক দুই বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তাঁরা এই তহবিলকে প্রথম ধাপে পাঁচ বিলিয়ন এবং পরবর্তীতে আট বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব দেন, যাতে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে অর্থায়ন সুবিধা পায়।
এছাড়া ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালা নিয়েও পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়। বর্তমানে কোনো ঋণ তিন মাস অনাদায়ী থাকলেই সেটিকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ব্যবসায়ীরা এই সময়সীমা ছয় মাসে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। একই সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে খেলাপি হিসেবে গণ্য হওয়ার বিধানও পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়।
ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। বর্তমানে এই সুবিধা চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সীমিত থাকলেও ব্যবসায়ী নেতারা এটিকে দশ বছরে উন্নীত করার প্রস্তাব দেন। তাঁদের যুক্তি অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি পুনঃতফসিল সুবিধা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক চাপ থেকে মুক্ত রেখে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করবে।
জ্বালানি ব্যয় হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পে স্বল্প সুদের বিশেষ ঋণ সুবিধা চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের মতে, টেকসই ও সবুজ শিল্পায়নের জন্য এ ধরনের নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।
বৈঠকে উত্থাপিত প্রধান প্রস্তাবগুলো নিচে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো—
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা | প্রস্তাবিত পরিবর্তন |
|---|---|---|
| ব্যাংক সুদের হার | তুলনামূলকভাবে উচ্চ | ধাপে ধাপে এক অঙ্কে নামানো |
| রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল | প্রায় ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার | ৫ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার |
| ঋণ খেলাপি শ্রেণিকরণ | ৩ মাসে খেলাপি ঘোষণা | ৬ মাসে বৃদ্ধি |
| ঋণ পুনঃতফসিল মেয়াদ | ৪–৫ বছর | ১০ বছর |
| বেসরকারি ঋণ প্রবাহ | সীমিত প্রবৃদ্ধি | বৃদ্ধি করার আহ্বান |
বৈঠক শেষে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বেশ কয়েকটি প্রস্তাবের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন এবং পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন। এতে ব্যবসায়ী মহলে নতুন করে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি আয় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করা হলে অর্থনীতির সামগ্রিক গতি আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
