১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত মূলধন ফেরতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাড়

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ আরও সহজতর ও আকর্ষণীয় করতে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করা মূলধন বা শেয়ার বিক্রয়লব্ধ অর্থ নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করবেন। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত মূলধন প্রত্যাবাসনের জন্য আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে না। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির এই উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নীতিমালায় বড় পরিবর্তন ও শিথিলকরণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে জারি করা সাম্প্রতিক এক প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। আগে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারের বাইরে থাকা (নন-লিস্টেড) সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তর বা বিক্রয়লব্ধ অর্থ বিদেশে পাঠাতে চাইলে মাত্র ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে পাঠাতে পারতেন। এর বেশি অংকের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। নতুন নিয়মে এই সীমা ১০ গুণ বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ, এখন থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোই নিজস্ব প্রক্রিয়ায় এই পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাঠানোর অনুমোদন দিতে পারবে।

নিচে নতুন নীতিমালার প্রধান পরিবর্তনগুলো টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয়ের বিবরণপূর্ববর্তী নিয়ম/সীমাবর্তমান নতুন নিয়ম/সীমা
স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনের সীমা১০ কোটি টাকা পর্যন্ত১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত
মূল্যায়ন প্রতিবেদন (Valuation)সকল লেনদেনের জন্য প্রয়োজন ছিল১ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রয়োজন নেই
নেট অ্যাসেট ভ্যালু (NAV)কড়াকড়ি নিয়ম ছিলনা পেরোলে যেকোনো অংক ব্যাংক পাঠাতে পারবে
আবেদন নিষ্পত্তির সময়নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না৫ কর্মদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে
মূল্যায়ন পদ্ধতির সংখ্যাঅস্পষ্ট ছিল৩টি আন্তর্জাতিক পদ্ধতি (NAV, Market, DCF)

স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণ

লেনদেনে গতি আনার পাশাপাশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ছোট অংকের লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (CFO) এবং বড় অংকের (১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত) লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (CEO) নেতৃত্বে এই কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটিতে পেশাদার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা সমমানের সনদধারী সদস্য থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শেয়ারের মূল্যায়ন প্রতিবেদন যাচাই করবেন।

সময়সীমা ও প্রক্রিয়াগত উন্নয়ন

নতুন প্রজ্ঞাপনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলো সব নথিপত্র ঠিক থাকলে ৫ কর্মদিবসের মধ্যে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া শেষ করবে। যদি কোনো বিশেষ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, তবে ব্যাংকগুলো ৩ কর্মদিবসের মধ্যে আবেদন পাঠাবে। এছাড়া, শেয়ার হস্তান্তরের জন্য ব্যবহৃত অডিট রিপোর্ট বা নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ৬ মাসের বেশি পুরোনো হওয়া চলবে না। এই সময়াবদ্ধ প্রক্রিয়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে প্রভাব

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে সেই দেশ থেকে লাভ বা মূলধন ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া কতটা সহজ, তা বিবেচনা করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদারীকরণ নীতি বিদেশি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে। বিশেষ করে স্টার্টআপ এবং বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো এখন থেকে আইনি জটিলতার ভয় ছাড়াই তাদের বিনিয়োগ সরাতে বা পুনর্নিয়োগ করতে পারবে। এটি মূলত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে একীভূত করার একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।

Leave a Comment