১০ হাজার টাকার কৃষিঋণের তথ্য তলব করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যের ব্যক্তিগত নির্দেশনায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষুদ্র কৃষিঋণের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারক অর্থাৎ গভর্নর নিজেই এই বিষয়ে অবগত নন। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকিং খাতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা।

রহস্যময় নির্দেশনা ও গভর্নরের অজ্ঞতা

গত বৃহস্পতিবার অফিস সময়ের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগ থেকে দেশের ব্যাংকগুলোতে একটি ই-মেইল পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যের জরুরি নির্দেশনায় ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ ভিত্তিক ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ও পল্লী ঋণের আসল, সুদ এবং বকেয়া স্থিতির তথ্য প্রদান করতে হবে। তথ্য পাঠানোর জন্য রবিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ব্যাংকগুলোর কাছে এমন কোনো তথ্য চাওয়া হয়েছে কি না, তা তার জানা নেই। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে আশ্বস্ত করেন। সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো তথ্য চাইলে তা একটি সুনির্দিষ্ট দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়, যেখানে সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্বাহী পরিচালক, ডেপুটি গভর্নর বা গভর্নরের অনুমোদন থাকে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই প্রথাগত নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি।

তথ্যের নেপথ্যে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও কৃষিঋণ বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, পরিচালনা পর্ষদের যে সদস্য এই তথ্য চেয়েছেন তিনি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর এই চেয়ারম্যান বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তিনি ঠিক কী কারণে বা কোন উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগতভাবে এই তথ্য চেয়েছেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া

রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা (এমডি) এই ঘটনায় কিছুটা বিব্রত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বেসরকারি ব্যাংকের এমডি জানান, “স্বল্প সময়ের নোটিশে ই-মেইলের মাধ্যমে এভাবে তথ্য চাওয়া খুবই অস্বাভাবিক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেশাদার আচরণ এখানে অনুপস্থিত।” রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের এমডি জানান, তার ব্যাংকে এমন প্রায় ৩০ হাজার ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা আছেন যাদের বকেয়া প্রায় ৫০ কোটি টাকা। যদি রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্যে এই ঋণ মওকুফের পরিকল্পনা করা হয়, তবে তা ব্যাংকিং খাতের জন্য আত্মঘাতী হবে। কারণ এটি আমানতকারীদের অর্থ এবং কোনো উপযুক্ত ভর্তুকি ছাড়া এভাবে ঋণ মওকুফ করা সম্ভব নয়।

নিচে সংবাদের প্রধান তথ্যগুলো একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয়ের ক্ষেত্রবিস্তারিত তথ্য
তথ্যের বিষয়সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ও পল্লী ঋণ।
তথ্যের ভিত্তি তারিখ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত বকেয়া স্থিতি।
নির্দেশনা দাতারাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর (পর্ষদ সদস্য, বাংলাদেশ ব্যাংক)।
গভর্নরের অবস্থানবিষয়টি সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ অবগত নন।
প্রাথমিক সময়সীমারবিবার দুপুর ১২টার মধ্যে তথ্য জমা দিতে হবে।
ব্যাংকগুলোর উদ্বেগপ্রথাগত নিয়ম লঙ্ঘন ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক ঋণ মওকুফের আশঙ্কা।

রাজনৈতিক যোগসূত্র ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সম্প্রতি একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তার সাথে এই তথ্য সংগ্রহের যোগসূত্র থাকতে পারে। ব্যাংকিং খাতের বোদ্ধাদের মতে, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার আচরণে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের ছাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা একটি স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য কাম্য নয়। আমানতকারীদের অর্থ এভাবে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে দেশের আর্থিক খাত দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পড়বে।

পরিশেষে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা এবং গভর্নরের অগোচরে পর্ষদ সদস্যের এমন নির্দেশনা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এটি কি কেবল তথ্য সংগ্রহ নাকি বড় কোনো নীতিনির্ধারণী পরিবর্তনের আভাস—তা এখন দেখার বিষয়।

Leave a Comment