২০২৬-২৭ বাজেট: অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সুপারিশ

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে বিশ্লেষকরা নাভিশ্বাস পরিস্থিতিতে প্রণয়ন হওয়ার আশা করছেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি দেশের অর্থনীতিকে বহুমুখী চাপে ফেলে দিয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এই পরিস্থিতিতে বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণ, কর ব্যবস্থায় সংস্কার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদারের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে তুলে ধরেছে।

ধানমন্ডিতে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন ২০২৬-২৭ বাজেটের প্রাথমিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “নতুন সরকারের প্রথম বাজেট এমন সময়ে প্রণয়ন করা হচ্ছে যখন দেশের অর্থনীতি মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ সংকটের মধ্যে রয়েছে। সুষ্ঠু নীতি গ্রহণ না করলে ঝুঁকি আরও গভীর হবে।”

রাজস্ব ঘাটতি ও উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি

সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি মাত্র ১২.৯ শতাংশ, যেখানে পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪.৫ শতাংশ। এ সময়ে প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০.৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বিষয়লক্ষ্য (%)বাস্তবায়ন (%)ঘাটতি/অবস্থান
রাজস্ব প্রবৃদ্ধি৩৪.৫১২.৯৬০,০০০ কোটি টাকা ঘাটতি
এডিপি বাস্তবায়ন১০০২০.৩১৫ বছরের সর্বনিম্ন

সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। জুলাই-ডিসেম্বর সময়কালে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৯,৬৫৫ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ বেসরকারি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক খাত

প্রথম আট মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮–৯ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন হলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৈদেশিক খাত মিশ্র চিত্র呈াচ্ছে; রপ্তানি ৩.২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, তবে প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক রিজার্ভের বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।

বৈদেশিক খাতজুলাই–ফেব্রুয়ারি ফলাফল
রপ্তানি-৩.২%
প্রবাসী আয়বৃদ্ধি
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ৩০.৪ বিলিয়ন ডলার
টাকার বিনিময় হারতুলনামূলক স্থিতিশীল

নীতি প্রস্তাবনা

সিপিডি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর হ্রাস, তামাকজাত পণ্যে কর বৃদ্ধি, কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে।

খাতসুপারিশ
নবায়নযোগ্য জ্বালানিসৌর প্যানেল, বায়ু টারবাইন ও ব্যাটারি স্টোরেজে কাস্টমস ডিউটি সর্বোচ্চ ৫%, ভ্যাট ১০%
তামাকজাত পণ্যসিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও গুলে স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ৫%, ভ্যাট ২০%
কৃষিসার সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও খাল পুনঃখনন
সামাজিক সুরক্ষা‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘ফার্মার কার্ড’ কার্যকরকরণ

সিপিডি মনে করছে, কার্যকর রাজস্ব সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের মাধ্যমে অর্থনীতি স্থিতিশীল পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। নতুন বাজেট কেবল ঘাটতি পূরণের নয়, বরং স্থিতিশীল ও টেকসই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করছে। সরকারি নীতি ও বাজেটary পদক্ষেপগুলির যথাযথ বাস্তবায়ন দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারে।

এইভাবে, ২০২৬-২৭ সালের বাজেট দেশের অর্থনৈতিক নীতি, সামাজিক সুরক্ষা এবং বিনিয়োগ প্রণোদনার একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করার সম্ভাবনা রাখে।

Leave a Comment