বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের মোট মূলধন পরিস্থিতি নেতিবাচক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে মাত্র তিন মাসের মধ্যে ২৩টি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২.৮২ লাখ কোটি টাকায়। এই অবনতি মূলত ঋণ ডিফল্টের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান দুর্বল শাসন ও ঋণ বিতরণের অনিয়মের কারণে ঘটেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত তথ্যভিত্তিক একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫ সময়কালে এই ঘাটতি প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতি ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার ওপর নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংকাররা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি আগ্রাসী ঋণ প্রদানের, দুর্বল তদারকি এবং রাজনৈতিক প্রভাবিত ঋণ অনুমোদনের ফল। ক্রমবর্ধমান মূলধন ঘাটতি ব্যাংকের ঋণ প্রদানের ক্ষমতাকেও সীমিত করছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
সেপ্টেম্বর ২০২৫ শেষে খাতের মূলধন-ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত (CRAR) নেতিবাচক ২.৯০% এ নেমে এসেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ন্যূনতম ১২.৫% বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। তুলনামূলকভাবে, জুন ২০২৫ এ এই অনুপাত ছিল ৪.৪৭%।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “অযত্নপূর্ণ ঋণ, বিশেষ করে পরিচালক প্রভাবিত ঋণ প্রদানের কারণে এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে লুকানো ঋণগুলো এখন প্রকাশ্যে আসছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।”
সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ডিফল্ট ঋণের পরিমাণ ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
ব্যাংকভিত্তিক মূলধন ঘাটতি (সেপ্টেম্বর ২০২৫ অনুযায়ী)
| ব্যাংকের ধরণ | ব্যাংকের নাম | মূলধন ঘাটতি (কোটি টাকা) |
|---|---|---|
| রাষ্ট্রায়ত্ত | জনতা ব্যাংক | ১৯,৯৭৩ |
| রাষ্ট্রায়ত্ত | অগ্রণী ব্যাংক | ৮,১২৫ |
| রাষ্ট্রায়ত্ত | রূপালি ব্যাংক | ৫,৬৫৫ |
| রাষ্ট্রায়ত্ত | বেসিক ব্যাংক | ৩,৯৪৫ |
| বেসরকারি | ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড | ১০,৬৫১ |
| বেসরকারি | এবি ব্যাংক | ৭,২০৫ |
| বেসরকারি | পদ্মা ব্যাংক | ৫,৮৩৭ |
| বেসরকারি | প্রিমিয়ার ব্যাংক | ৪,৭৩৩ |
| বেসরকারি | আইএফআইসি ব্যাংক | ৪,৪৫৫ |
| ইসলামী ব্যাংক | ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক | ৬৫,০৯০ |
| ইসলামী ব্যাংক | ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেড | ২৭,১০৩ |
| বিশেষায়িত ব্যাংক | বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক | ২৯,৮০৪ |
| বিশেষায়িত ব্যাংক | রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক | ২,৬৭৩ |
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইসলামী ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতির মধ্যে রয়েছে। আটটি শারিয়া ভিত্তিক ব্যাংকের মিলিত ঘাটতি ১.৭৫ লাখ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এই মূলধন সংকট ব্যাংক খাতের অন্তর্গত সমস্যা নয়, বরং এটি একটি গঠনগত ও কাঠামোগত সংকট। সুদৃঢ় শাসন ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা রয়েছে এমন ব্যাংকগুলো ১৩–১৪% মূলধন অনুপাত বজায় রাখতে সক্ষম।
সংকট মোকাবিলায় তাত্ক্ষণিকভাবে নতুন মূলধন সঞ্চালন প্রয়োজন, যা অর্জন করা যেতে পারে ব্যাংকের মুনাফা পুনঃবিনিয়োগ অথবা নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে। তবে ব্যবসার কম মুনাফা ও বিনিয়োগকারীর আস্থা কম থাকায় এটি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্রুত “জামা” প্রতিষ্ঠানগুলোর সমাধান, কার্যকর ব্যাংক পুনর্গঠন কাঠামো ও ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি প্রয়োজন। প্রধান ঋণগ্রহীতাদের প্রকাশ্যভাবে শনাক্ত করা এবং কঠোর শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
উপসংহারে, ব্যাংক খাতের ক্রমবর্ধমান মূলধন সংকট কেবল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া সমগ্র অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
