৯০ শতাংশের বেশি খেলাপি ছয় ব্যাংক, আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থার সংকট

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের যে ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ পেয়েছে, তা অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সেপ্টেম্বর শেষে মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ খেলাপি হওয়া শুধু পরিসংখ্যানগত সংকট নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।

এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়া প্রমাণ করে যে আগের সময়ে বাস্তব অবস্থা আড়াল করা হয়েছিল। নীতি সহায়তা, পুনঃতফসিল ও বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ নিয়মিত দেখানো হলেও বাস্তবে আদায় হয়নি। সেই কৃত্রিম অবস্থা ভেঙে পড়তেই প্রকৃত সংকট সামনে এসেছে।

সব ব্যাংক সমান ঝুঁকিতে না থাকলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যাংক কার্যত অচল অবস্থায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে ছয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯০ শতাংশ ছাড়ানো মানে এসব ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোই কঠিন। এতে আমানতকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ এম. হেলাল আহমেদ জনি মনে করেন, ব্যাংক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত না হলে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি ব্যাংক নীতিতে শিথিলতা আসে, তবে খেলাপি ঋণ আবারও বাড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একীভূতকরণ উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের পরিকল্পনার মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা, খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনাই পারে এই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো অর্থনীতিবিদ এম. হেলাল আহমেদ জনির মতে, খেলাপি ঋণ বাড়তে দেওয়া কোনো অর্থনীতির জন্যই শুভ নয়। তিনি মনে করেন, ব্যাংক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে খেলাপি ঋণের প্রবণতা আবারও বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কঠোর ও স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে শরিয়াহভিত্তিক কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, একীভূতকরণই শেষ কথা নয়; প্রয়োজন কঠোর জবাবদিহি, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা ব্যবস্থা।

Leave a Comment