মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি ও সারের বাজারে তৈরি হওয়া অস্থিরতা মোকাবিলা এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করতে বাংলাদেশের জন্য ১১০ কোটি মার্কিন ডলারের জরুরি সহায়তা অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি ২৬ জুন এক বিজ্ঞপ্তিতে এ অর্থায়নের ঘোষণা দেয়।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও সারের মূল্য বৃদ্ধি এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা, খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা বাড়াতেই এ অর্থায়ন দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে খাদ্য, সার ও জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। এর ফলে সরকারি ব্যয় বেড়েছে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র কৃষক, নিম্নআয়ের মানুষ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। এই বাস্তবতায় দ্রুত সহায়তার মাধ্যমে সংকটের প্রভাব কমিয়ে আনতে চায় বিশ্বব্যাংক।
মোট অর্থায়নের মধ্যে ৩০ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে ইমার্জেন্সি সাপোর্ট ফর ফুড সিকিউরিটি (খাদ্য নিরাপত্তায় জরুরি সহায়তা) প্রকল্পের জন্য। এই প্রকল্পের আওতায় চলতি বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আমন মৌসুম এবং ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বোরো মৌসুমের জন্য প্রয়োজনীয় সার আমদানিতে অর্থ ব্যয় করা হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট সারের চাহিদার ৮৫ শতাংশেরও বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন সার আমদানি করা হবে, যার অর্ধেকই হবে ইউরিয়া। এই সার ব্যবহার করে প্রায় ১৪ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে ধান চাষ অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে বিশেষভাবে উপকৃত হবেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা, যারা দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট ও প্রকল্পটির টাস্ক টিম লিডার সোলেমান কুলিবালি বলেন, বাংলাদেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে আমন ও বোরো মৌসুম থেকে। দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ফলে সারের সরবরাহ ব্যাহত হলে শুধু খাদ্য উৎপাদন নয়, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ ছাড়া কনটিনজেন্ট ইমার্জেন্সি রেসপন্স কর্মসূচির আওতায় ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ সম্ভাব্য দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য নগদ সহায়তা, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পুনর্বাসন এবং জীবিকা পুনর্গঠনে ব্যয় করা হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও আয় স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগেও এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।
জরুরি প্রয়োজনে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতেও এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে। এর ফলে বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য, ওষুধ এবং চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় জনসেবাগুলো অব্যাহত রাখা সহজ হবে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, প্রকল্পের অর্থ আগামী ৩০ জুনের মধ্যে ছাড় করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
বিশ্বব্যাংকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং প্রকল্পটির টাস্ক টিম লিডার লেসলি জিন ইউ করদেরো বলেন, বিদ্যমান বিভিন্ন প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থ পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে জরুরি সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে দ্রুত সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সচল রাখতে সহায়তা করলে কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতাও বজায় থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের দামের অস্থিরতার মধ্যে কৃষি উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ এবং জরুরি সেবা অব্যাহত রাখতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে কৃষি খাতের উৎপাদন ধরে রাখা এবং সংকটকালে নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই সহায়তা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
