মূলধনী ব্যয় হ্রাসে বেসিক ব্যাংকের নতুন উদ্যোগ

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংক তাদের আমানতের ভিত্তি শক্তিশালী করতে, তহবিল সংগ্রহের ব্যয় বা মূলধনী ব্যয় হ্রাস করতে এবং সার্বিক আর্থিক অবস্থার উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে সরকারি ও দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পসমূহের হিসাব খোলার ও পরিচালনার অনুমতি চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক দাপ্তরিক পত্রে ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু মো. মোফাজ্জল এই সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত ওই পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত এই ব্যাংকটির জন্য উচ্চ সুদের আমানতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ব্যাংকের একটি বড় অংশের ঋণ শ্রেণীকরণ বা খেলাপি হয়ে পড়া এবং উচ্চ ব্যয়ের আমানত সংগ্রহের কারণে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না, যা মূলত তাদের তহবিল সংগ্রহের ব্যয়কে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বেসিক ব্যাংক ইতিমধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একটি সময়াবদ্ধ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। এই কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাংকটি কম সুদের এবং শূন্য সুদের আমানত আকর্ষণের জন্য তাদের প্রচেষ্টা জোরদার করেছে।

রাষ্ট্রীয় খাতের অন্যান্য ব্যাংকের সাথে বেসিক ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক তুলনা

বর্তমানে সরকারি ও দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পসমূহের হিসাবগুলো মূলত সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক এবং হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের মতো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে পরিচালিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত ও মূলধনের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

ব্যাংকের নাম ও আর্থিক খাতের বিবরণসরকারি ও দাতা সংস্থার প্রকল্প হিসাব পরিচালনাআমানতের ধরন ও মূলধনী ব্যয়ের সুবিধাবেসিক ব্যাংকের বর্তমান মূলধন কাঠামো
সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকনিয়মিত পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করা হয়।কম সুদের ও সুদবিহীন আমানতের কারণে মূলধনী ব্যয় অনেক কম।প্রযোজ্য নয়।
হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশননির্দিষ্ট প্রকল্প হিসাবসমূহ পরিচালনা করে।কম ব্যয়ের তহবিলের কারণে ইতিবাচক আর্থিক কর্মক্ষমতা।প্রযোজ্য নয়।
বেসিক ব্যাংক লিমিটেডঅনুমতির জন্য সরকারের কাছে আবেদন প্রক্রিয়াধীন।উচ্চ সুদের আমানতের কারণে মূলধনী ব্যয় বর্তমানে অনেক বেশি।

অনুমোদিত মূলধন: ৫৫ বিলিয়ন টাকা।


পরিশোধিত মূলধন: ১০.৮৫ বিলিয়ন টাকা।

বেসিক ব্যাংকের ঐতিহাসিক সংকটের প্রেক্ষাপট ও অনিয়ম

বেসিক ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক সংকটের সূত্রপাত মূলত সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুর কার্যকাল থেকে শুরু হয়। তিনি ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিন বছরের মেয়াদে চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন এবং পরবর্তীতে ২০১২ সালে তাঁর মেয়াদের আরও দুই বছরের সম্প্রসারণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর কার্যকালে ব্যাংকের সার্বিক কর্মক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। তিনি এবং পরিচালনা পর্ষদের বেশ কয়েকজন সদস্য ব্যাংক কোম্পানি আইনের নিয়ম ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ঋণ অনুমোদনের মতো গুরুতর অনিয়মের সাথে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে সরকার ব্যাংকটির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উদঘাটিত হয়েছে যে, ২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বেসিক ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা এবং শান্তিনগর শাখার মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছিল। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বোঝা কমিয়ে একটি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার লক্ষ্যে ব্যাংকটি বর্তমানে একটি তিন বছর মেয়াদী বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, যার মধ্যে বিভিন্ন পুনরুদ্ধার ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের পাঠানো তথ্যমতে, সরকারি সহায়তায় ব্যাংকটি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ব্যাংকের মোট হিসাবের সংখ্যা ৪৮,৭৪০ এ পৌঁছেছে, যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বেসিক ব্যাংকে সরকারি ও দাতা সংস্থার প্রকল্প হিসাব খোলার সংক্রান্ত প্রস্তাবটি সম্প্রতি তাঁরা পেয়েছেন এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।

Leave a Comment