সুদ না কমলে বাড়বে না বিনিয়োগ

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চড়া সুদ এবং তীব্র জ্বালানি সংকটের ত্রিমুখী চাপে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের বেসরকারি খাত। এ অবস্থা চলতে থাকলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দা দেখা দিতে পারে বলে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাকরাইলে আইডিইবি মিলনায়তনে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত এক বাজেট আলোচনা সভায় এই বাস্তব চিত্র উঠে আসে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থনীতি সমিতির অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আহ্বায়ক মাহবুব উল্লাহর সভাপতিত্বে সভায় দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদেরা বর্তমান অর্থনীতির নানামুখী সংকট নিয়ে মোট সাতটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

বক্তারা বলেন, নতুন করে বন্ধ কারখানা চালু করার জন্য বাজেটে প্রণোদনা তহবিলের উদ্যোগটি ভালো। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচল থাকা বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখা। কারণ, দেশের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। এত উচ্চ কর এবং ডাবল ডিজিটের (১০ শতাংশের কাছাকাছি) সুদ দিয়ে কোনো দেশেই সুস্থ ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই অর্থনীতিকে সচল করতে অবিলম্বে নীতি সুদহার কমানোর পাশাপাশি করের টাকার অপচয় বন্ধের তাগিদ দেন তাঁরা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমরা দেশের দীর্ঘদিনের প্রচলিত বাজেটের মডেলটাকে পুরোপুরি পরিবর্তন করার চেষ্টা করছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ, যাতে দেশের নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী নয়, বরং সব স্তরের মানুষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সমান সুযোগ পায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অতীতে এটি একটি বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল, যেখানে একটি বিশেষ গোষ্ঠী সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। আমরা বর্তমান বাজেটের মাধ্যমে সেই বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছি।”

সভায় ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান আবু আহমেদ প্রতিবেশী দেশের উদাহরণ টেনে বলেন, “ভারতে যেখানে নীতি সুদহার সাড়ে ৬ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে বাংলাদেশে এটি ১০ শতাংশ ছুঁইছুঁই। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সবার জন্য ঋণের সুদের হার অবিলম্বে কমিয়ে আনতে হবে।” অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ব্যাংক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এই মুহূর্তে সরকারের সবচেয়ে বড় কাজ হওয়া উচিত।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বিসিআই-এর সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী শিল্প খাতের সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি আসবে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি প্রতিষ্ঠানটিতে আমূল সংস্কারের দাবি জানান।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, অর্থনীতিকে আগে পুরোপুরি স্থিতিশীল করতে হবে, অন্যথায় মূল্যস্ফীতি আবার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক সায়মা হক শিক্ষা খাতের সরঞ্জাম ও অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়নে বিশেষ প্রকল্প নেওয়ার তাগিদ দেন। সভায় আরও বক্তব্য দেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনূস, কাজী ইকবাল এবং বুয়েটের শিক্ষক নাজমুল ইসলাম। সব মিলিয়ে বক্তারা একমত হন যে, সামষ্টিক অর্থনীতির কার্যকর সংস্কার ছাড়া বেসরকারি খাতে প্রাণ ফেরানো সম্ভব নয়।

মন্তব্য করুন