দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডে চলমান তারল্য সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক পুনরায় বড় অঙ্কের বিশেষ সহায়তা প্রদান করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকদের নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকটির দৈনন্দিন তারল্য ব্যবস্থাপনায় গুরুতর চাপ সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতিরিক্ত দুই হাজার পাঁচশ কোটি টাকা সহায়তা অনুমোদন করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রাথমিকভাবে একই পরিমাণ সহায়তা প্রদানের পরিকল্পনা থাকলেও পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি এবং নগদ উত্তোলনের ধারাবাহিক প্রবণতার কারণে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হয়। শুরুতে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে প্রায় দশ হাজার কোটি টাকার সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো হয়েছিল, যা বিদ্যমান চাপের গভীরতা নির্দেশ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাসের প্রথম নয় দিনে ইসলামী ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করেন। এর মধ্যে প্রথম সাত দিনেই আমানত কমে যায় চার হাজার দুইশ চার কোটি টাকা। পরবর্তী দুই দিনে আরও প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা উত্তোলিত হওয়ায় ব্যাংকটির নগদ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। দেশের বিভিন্ন শাখা ও নগদ বিতরণ যন্ত্রে পর্যাপ্ত অর্থ সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুত তদারকি জোরদার করে এবং ব্যাংকটির সার্বিক আর্থিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা শুরু করে। পাশাপাশি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সংকটের কারণ, তার প্রভাব এবং সম্ভাব্য উত্তরণের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন অনুযায়ী ধারাবাহিক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাসও প্রদান করে।
পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ব্যাংকটির পরিচালন কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনে। ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ সকল পরিচালককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালকের ওপর অস্থায়ীভাবে ন্যস্ত করা হয়। ব্যাংক কোম্পানি সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ব্যাংকের শাসন কাঠামো পুনর্গঠন, আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে প্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকদের বড় অঙ্কের নগদ উত্তোলনের কারণে তারল্য ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা ব্যাংকটির দৈনন্দিন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে তারা মনে করছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতির একটি সারসংক্ষেপ নিচে উপস্থাপন করা হলো—
| সময়কাল | ঘটনা | অর্থের পরিমাণ |
|---|---|---|
| প্রাথমিক পর্যায় | প্রথম তারল্য সহায়তা অনুমোদন | প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা |
| পরবর্তী সিদ্ধান্ত | অতিরিক্ত তারল্য সহায়তা অনুমোদন | আরও প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা |
| ১–৯ জুন | গ্রাহক উত্তোলন | প্রায় ৬০০০ কোটি টাকা |
| ১–৭ জুন | আমানত হ্রাস | ৪২০৪ কোটি টাকা |
| পরবর্তী দুই দিন | অতিরিক্ত উত্তোলন | প্রায় ২০০০ কোটি টাকা |
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা দেশের সামগ্রিক ব্যাংক খাতে তারল্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে। বড় পরিসরে আমানত উত্তোলনের চাপ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্রুত হস্তক্ষেপ ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়ক হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহক আস্থা পুনর্গঠন এবং আমানতের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা ব্যাংকটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
