ব্যক্তিগত ঋণে স্বস্তি, পরিশোধের মেয়াদ এখন আট বছর

দেশের খুচরা ঋণ বাজারে গতি আনতে এবং সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাংকঋণ আরও সহজলভ্য করতে ব্যক্তিগত ঋণ পরিশোধের সর্বোচ্চ মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে আট বছর করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে ঋণগ্রহীতাদের মাসিক কিস্তির চাপ কমবে, একই সঙ্গে তুলনামূলক বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার সুযোগও বাড়বে বলে মনে করছেন ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে চাকরিজীবী, মধ্যবিত্ত পরিবার এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এই পরিবর্তন অর্থায়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বৃহস্পতিবার জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যক্তিগত ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি ভোক্তা ঋণসংক্রান্ত আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়। এসব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে খুচরা ঋণ কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা এবং অর্থনীতিতে ভোক্তা ব্যয় ও বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন নির্দেশনার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ভোক্তা ঋণের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আগে থেকে চালু থাকা একটি বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। আগে কোনো ব্যাংকের ভোক্তা ঋণের প্রবৃদ্ধি যদি সামগ্রিক ঋণ প্রবৃদ্ধিকে অতিক্রম করত, তাহলে সেই ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এর কারণ ব্যাখ্যা করতে হতো। এখন থেকে আর সেই বাধ্যবাধকতা থাকছে না। ফলে ব্যাংকগুলো খুচরা ঋণ বিতরণে তুলনামূলকভাবে আরও বেশি নমনীয়তা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ব্যাংকারদের মতে, ব্যক্তিগত ঋণের পরিশোধকাল তিন বছর বাড়ানোর ফলে মাসিক কিস্তির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এতে একই আয়ের গ্রাহকের পক্ষে ঋণ পরিশোধ সহজ হবে এবং অনেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণে উৎসাহিত হবেন। এর পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর খুচরা ঋণ পোর্টফোলিও সম্প্রসারণের সুযোগও বাড়বে।

এর আগে গত মাসের শুরুতে মূল্যস্ফীতি, বাজারদর বৃদ্ধি এবং ভোক্তা পণ্যের চাহিদার পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ভোক্তা ঋণের সর্বোচ্চ সীমা দ্বিগুণ করে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো এখন সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ভোক্তা ঋণ দিতে পারবে। আগে এই সীমা ছিল ২০ লাখ টাকা। তবে গ্রাহকের ব্যাংকে জমা রাখা আমানতের বিপরীতে দেওয়া ঋণ এই সীমার আওতার বাইরে থাকবে।

অটোমোবাইল খাতেও নতুন সুবিধা ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গাড়ি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং হাইব্রিড গাড়ি কেনার জন্য এখন সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে। আগে এই সুবিধা কেবল বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির জন্য প্রযোজ্য ছিল। নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশে উৎপাদিত গাড়িকেও একই সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে, যা দেশীয় শিল্পের বিকাশে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়ির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঋণের সীমা ৬০ লাখ টাকাই বহাল রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহ দেওয়ার নীতিগত অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গাড়ি ঋণের অর্থায়ন কাঠামোতেও নির্দিষ্ট অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণ জ্বালানিচালিত গাড়ির ক্ষেত্রে ঋণ ও গ্রাহকের নিজস্ব অর্থের অনুপাত হবে সর্বোচ্চ ৬০:৪০। অর্থাৎ এক কোটি টাকা মূল্যের একটি গাড়ি কিনতে ব্যাংক সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা অর্থায়ন করবে এবং বাকি ৪০ লাখ টাকা গ্রাহককে নিজস্ব উৎস থেকে পরিশোধ করতে হবে।

অন্যদিকে বৈদ্যুতিক, হাইব্রিড এবং দেশে উৎপাদিত গাড়ির ক্ষেত্রে ঋণ ও নিজস্ব অর্থের অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ৮০:২০। ফলে একই মূল্যের একটি গাড়ি কিনতে ব্যাংক ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেবে এবং গ্রাহককে নিজস্ব তহবিল থেকে মাত্র ২০ লাখ টাকা জোগান দিতে হবে। এই সুবিধা পরিবেশবান্ধব যানবাহারের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ব্যক্তিগত ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধি, ভোক্তা ঋণের সীমা দ্বিগুণ করা, খুচরা ঋণের প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং দেশীয় ও পরিবেশবান্ধব গাড়ির জন্য অধিক অর্থায়নের সুযোগ—এই সমন্বিত পদক্ষেপগুলো দেশের খুচরা ঋণ বাজারে নতুন গতি আনতে পারে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ, ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি, দেশীয় শিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এসব সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

মন্তব্য করুন