এশীয় ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) মার্চ-এপ্রিল মেয়াদের আমদানি দায় বা বিল পরিশোধের পর বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বা মোট মজুত হ্রাস পেয়ে ৩৪.১৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। রোববার (১০ মে, ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের এই হালনাগাদ তথ্য প্রদান করা হয়েছে। মূলত প্রতি দুই মাস অন্তর আকুর পাওনা পরিশোধের বাধ্যবাধকতার কারণে নির্দিষ্ট সময় পর পর রিজার্ভের পরিমাণে এই ধরনের হ্রাস-বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পেমেন্ট একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া এবং এটি দেশের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতারই অংশ।
Table of Contents
রিজার্ভের বর্তমান স্থিতি ও তুলনামূলক চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৭ মে কর্মদিবস শেষে দেশের মোট গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৫.৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে মার্চ-এপ্রিল সময়ের জন্য আমদানির বিপরীতে আকুর বিল বাবদ মোট ১৫১ কোটি ৪৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার পরিশোধ করার পর এই মজুত কমে ৩৪.১৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্দেশিত হিসাব পদ্ধতি বা ‘বিপিএম৬’ (BPM6) অনুযায়ীও রিজার্ভের পরিমাণে আনুপাতিক পরিবর্তন এসেছে।
৭ মে বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুসারে দেশের রিজার্ভের স্থিতি ছিল ৩০.৯৬ বিলিয়ন ডলার। আকুর বিল পরিশোধের পর এই হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯.৪৭ বিলিয়ন ডলার। উল্লেখ্য যে, নিট রিজার্ভ বা ব্যয়যোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ সাধারণত বিপিএম৬ পদ্ধতির চেয়েও কিছুটা কম হয়ে থাকে, যা থেকে বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদী দায়বদ্ধতা বাদ দিয়ে প্রকৃত ব্যয়যোগ্য সক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়।
আকু বিল পরিশোধের ধারাবাহিকতা ও পরিসংখ্যান
আকু হলো এশিয়ার কয়েকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যকার একটি আন্ত-আঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে সম্পন্ন হওয়া আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মূল্য প্রতি দুই মাস অন্তর সমন্বিতভাবে পরিশোধ করা হয়। বিগত কয়েক মেয়াদের আকু বিল পরিশোধের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে:
মার্চ-এপ্রিল ২০২৬ (বর্তমান): ১৫১ কোটি ৪৯ লাখ ডলার।
জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ১৩৬ কোটি ৮৭ লাখ ডলার।
নভেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৫: ১৫৩ কোটি ডলার।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০২৫: ১৬১ কোটি ডলার।
জুলাই-আগস্ট ২০২৫: ১৫০ কোটি ডলার।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমদানির চাহিদার ওপর ভিত্তি করে বিলের পরিমাণের কিছুটা তারতম্য ঘটলেও তা সাধারণত ১৩৫ থেকে ১৬৫ কোটি ডলারের মধ্যে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমান পরিশোধিত বিলটি মূলত জ্বালানি তেল, জরুরি খাদ্যপণ্য এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানির বিপরীতে সৃষ্ট দায়ের বিপরীতে প্রদান করা হয়েছে।
এশীয় ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (আকু) এর ভূমিকা
আকু বা ‘এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন’ (ACU) ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি বহুপাক্ষিক পেমেন্ট গেটওয়ে। বর্তমানে এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভুটান এবং মালদ্বীপ। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রসমূহ নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তি করে থাকে। এর প্রধান সুবিধা হলো, এর ফলে দেশগুলোকে প্রতিটি বাণিজ্যের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধ করতে হয় না, বরং প্রতি দুই মাস পর নিট পাওনা সমন্বয় করলেই চলে। তবে আকু সদস্য বহির্ভূত দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের লেনদেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নিয়ম অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে সম্পন্ন হয়।
রিজার্ভের স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
রিজার্ভের এই সাময়িক পতনকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি স্বাভাবিক ও নিয়মিত প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করছে। কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এবং রপ্তানি আয়ের প্রবাহ অত্যন্ত ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মে মাসের প্রথম দশ দিনেই দেশে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে, যা আকু বিল পরিশোধজনিত রিজার্ভের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষ থেকে ঋণের কিস্তি এবং বাজেট সহায়তা হিসেবে বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিলাসপণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ এবং হুন্ডি প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার অপ্রয়োজনীয় বহিঃপ্রবাহ আগের চেয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত। অর্থনীতিবিদদের মতে, রপ্তানি ও প্রবাস আয়ের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকলে এবং বৈদেশিক ঋণের গতি বাড়লে রিজার্ভে দ্রুত স্বস্তি ফিরবে। বর্তমানে যে পরিমাণ রিজার্ভ মজুত রয়েছে, তা দিয়ে আগামী ৫ থেকে ৬ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশের অর্থনীতির জন্য সন্তোষজনক সীমা হিসেবে বিবেচিত।
১০ মে প্রকাশিত এই দাপ্তরিক তথ্যটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, আগামী মাসগুলোতে রিজার্ভের গ্রাফ পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হবে।
