ইস্টার্ন ব্যাংকে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির অভিযোগ: অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক

দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (ইবিএল)-এর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভুয়া ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করে অর্থ আত্মসাৎ এবং গ্রাহককে হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের পর এই অনিয়ম খতিয়ে দেখতে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়া শুরু করেছে। জালিয়াতির মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে ৫ লাখ ৪৭ হাজার ১৪৩ টাকা আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছে।

২০২৬ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, কমিশনের সাম্প্রতিক এক সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই ছায়া তদন্ত শুরু হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

অভিযোগের বিশদ ও অর্থ আত্মসাতের কৌশল

দুদক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অজান্তেই তাদের নথিপত্র ব্যবহার করে অথবা সম্পূর্ণ ভুয়া তথ্য দিয়ে ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই প্রক্রিয়ায়:

  • তহবিল তছরুপ: প্রকৃত গ্রাহকের স্বাক্ষর বা সম্মতি ছাড়াই ক্রেডিট কার্ড সক্রিয় করা হয় এবং পরবর্তীতে সেই কার্ড থেকে ধাপে ধাপে ৫ লাখ ৪৭ হাজার ১৪৩ টাকা উত্তোলন বা কেনাকাটার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

  • গ্রাহক হয়রানি ও ক্রেডিট স্কোর: এই জালিয়াতির ফলে সাধারণ গ্রাহকরা অজান্তেই ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না হওয়ায় গ্রাহকদের ক্রেডিট স্কোর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ ঋণ প্রাপ্তির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাহকদের পক্ষ থেকে আসা সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই দুদক এই অনুসন্ধান শুরু করে।

দুদকের অনুসন্ধান কাঠামো ও কার্যপরিধি

ইস্টার্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এই দুর্নীতি ও অনিয়মের তদন্তভার দেওয়া হয়েছে দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়কে। কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, তদন্তকারী কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করছেন:

১. রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণ: ব্যাংক থেকে সংশ্লিষ্ট ক্রেডিট কার্ড ইস্যু সংক্রান্ত যাবতীয় আবেদন ফরম, আবেদনকারীর কেওয়াইসি (KYC) এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ করে তা যাচাই করা হচ্ছে। ২. দায়িত্বশীলদের শনাক্তকরণ: কার্ড অনুমোদন এবং বিতরণের প্রক্রিয়ায় কোন কোন কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন এবং তাদের পক্ষ থেকে পেশাদারিত্বের অবহেলা বা সরাসরি যোগসাজশ ছিল কি না, তা নিরূপণ করা হচ্ছে। ৩. লেনদেনের গতিপথ: আত্মসাৎকৃত অর্থ কোন কোন মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং চূড়ান্তভাবে সেই অর্থ কার অ্যাকাউন্টে বা কার কাছে পৌঁছেছে, তার একটি পূর্ণাঙ্গ ‘মানি ট্রেইল’ তৈরির কাজ চলছে।

কমিশনের কঠোর অবস্থান ও নির্দেশাবলী

দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে জারি করা বিশেষ নির্দেশনায় এই অনুসন্ধান কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে যেন তারা কোনো ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সাথে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ব্যাংক কর্মকর্তাদের এমন জালিয়াতি সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। তাই সংশ্লিষ্ট মূল নথি বা রেকর্ডপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বিলম্ব বা অসহযোগিতা করা হলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। দুদকের চূড়ান্ত সুপারিশের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ বা মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।

আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রভাব

ইস্টার্ন ব্যাংকের মতো একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের অভ্যন্তরে এমন অনিয়ম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি এবং ব্যাংকের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা (Internal Audit) ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সাধারণত ক্রেডিট কার্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে যে মাল্টি-লেয়ার ভেরিফিকেশন বা বহুস্তরীয় যাচাইকরণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, এই ঘটনায় তার ব্যত্যয় ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

দুদক কর্মকর্তারা মনে করছেন, ৫ লাখ ৪৭ হাজার ১৪৩ টাকার এই অভিযোগটি কেবল একটি বৃহত্তর অনিয়মের হিমশৈলের চূড়া হতে পারে। অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় আরও বড় কোনো সিন্ডিকেট বা উচ্চ অংকের জালিয়াতির তথ্য বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে এই তদন্তটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

উল্লেখ্য যে, দুদক বর্তমানে দেশের একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ক্রেডিট কার্ড এবং ঋণ জালিয়াতি সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে কাজ করছে। ইস্টার্ন ব্যাংকের এই ঘটনাটি তদন্তাধীন থাকায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। দুদকের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর এই জালিয়াতির প্রকৃত গভীরতা এবং দায়ীদের পরিচয় জনসম্মুখে উন্মোচিত হবে।


Leave a Comment