খেলাপি ঋণ আড়াল প্রকৃত সংকট অব্যাহত

দেশের অর্থনীতি টানা কয়েক বছর ধরে বহুমুখী চাপ ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বিভিন্ন কারণ মিলিয়ে বিদ্যমান সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে বলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির কিছু সূচকে সাময়িক স্বস্তি দেখা গেলেও তা টেকসই নয় এবং এর আড়ালে বহু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। ব্রিফিংয়ের বিষয় ছিল ‘২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’। এতে বক্তব্য দেন সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

সিপিডির মতে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা কমে এলেও এটি প্রকৃত উন্নতির প্রতিফলন নয়। বরং ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং রাইট-অফের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আইন ও বিধিবিধানের দুর্বল বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি সংকটকে আরও জটিল করেছে।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, অর্থনীতির কিছু সূচকে সাময়িক স্বস্তির আভাস মিললেও তা স্থায়ী নয়। আর্থিক, সামাজিক এবং উৎপাদন খাত বর্তমানে নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে, যা নতুন নয় বরং কয়েক বছর ধরেই বিদ্যমান। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মূল্যস্ফীতি, সরকারি অর্থায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের সমস্যাগুলো এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ৩৫.৭ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চে নেমে আসে ৩২.২৬ শতাংশে। তবে এই হ্রাসকে প্রকৃত সম্পদমানের উন্নতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। একই সময়ে অতিরিক্ত তারল্যের হার ৪৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে। ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) ০.৮৯ থেকে কমে ০.৮৪ হয়েছে, যা বেসরকারি খাতে দুর্বল ঋণ চাহিদার ইঙ্গিত দেয়।

ব্যাংকিং খাতের কিছু সূচক

সূচক২০২৫ সালের অবস্থা২০২৬ সালের অবস্থা
খেলাপি ঋণের হার৩৫.৭% (সেপ্টেম্বর)৩২.২৬% (মার্চ)
অতিরিক্ত তারল্য৪৩% (মে)৫৫% (মার্চ)
ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর)০.৮৯০.৮৪

সিপিডি জানায়, ১৭টি ব্যাংকের অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি খেলাপি ঋণ পাওয়া গেছে, যা ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে প্রকাশিত তথ্যের বড় পার্থক্য নির্দেশ করে।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত নয়। জুলাই–মার্চ সময়ে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৬.৯ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শেষ প্রান্তিকে ৮৪.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা অর্জন করা কঠিন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাই–এপ্রিল সময়ে এনবিআরের কর আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা।

ড. ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, ২০২৬ সালের এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ শতাংশ, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.৩৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৫৭ শতাংশ। জ্বালানি, পরিবহন ও সেবা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধি হয়েছে ৮.১৬ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম হওয়ায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।

সিপিডি বলছে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সাময়িক কিছু সূচক উন্নতি দেখালেও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়।

Leave a Comment