দেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অস্থিরতা, উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সাম্প্রতিক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত হওয়ার পর আগামী জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানে সুশাসনের ঘাটতি, ঋণ আদায়ে চরম ব্যর্থতা এবং আমানতকারীদের দায় পরিশোধে অক্ষমতার কারণে আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। ফলে ধাপে ধাপে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবসায়নের পথে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
অবসায়নের তালিকায় রয়েছে এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই কার্যত অচল হয়ে পড়েছে এবং স্বাভাবিক ঋণ আদায় কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছে।
খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র
নিচের তথ্য থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের সংকটের মাত্রা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়—
| প্রতিষ্ঠানের নাম | খেলাপি ঋণের হার |
|---|---|
| এফএএস ফাইন্যান্স | ৯৯.৯৯ শতাংশ |
| ফারইস্ট ফাইন্যান্স | ৯৮.৫০ শতাংশ |
| আভিভা ফাইন্যান্স | ৯৩.৯৩ শতাংশ |
| পিপলস লিজিং | প্রায় ৯৫ শতাংশ |
| ইন্টারন্যাশনাল লিজিং | ৯৯.৪৪ শতাংশ |
এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পোর্টফোলিও প্রায় সম্পূর্ণভাবে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা তাদের কার্যকারিতা ধরে রাখাকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।
অবসায়ন প্রক্রিয়ার কাঠামো
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একজন করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। তাদের সহায়তায় আরও দুইজন করে কর্মকর্তা যুক্ত থাকবেন। এই প্রশাসকরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, দায় এবং ঋণ আদায়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করবেন। পাশাপাশি ধাপে ধাপে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতেই প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। সরকার আগামী বাজেটে এই অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে বলে জানা গেছে। এই আর্থিক নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই অবসায়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্তভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে।
সংকটের পেছনের কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে এই খাতে সুশাসনের অভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং প্রভাবশালী মহলের ঋণ অনিয়ম পরিস্থিতিকে ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। অতীতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিপুল পরিমাণ ঋণ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে পি কে হালদারের বিরুদ্ধে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং এবং এফএএস ফাইন্যান্সসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে আসে, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভিত্তি ভেঙে দেয়।
গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় বিশটি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। পর্যালোচনার পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তালিকা থেকে বাদ পড়লেও বর্তমান পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে অবসায়নের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি আটকে থাকা আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের পথও খুলবে, যদিও পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সময় লাগবে।
