দেশে ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও বিনিয়োগবান্ধব করার লক্ষ্যে সরকার একাধিক প্রশাসনিক ও নীতিগত সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বহুস্তরবিশিষ্ট লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে একজন নতুন উদ্যোক্তাকে ব্যবসা শুরু করতে প্রায় এক বছর পর্যন্ত সময় ব্যয় করতে হতো। এই বাস্তবতা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে সরকার এখন ব্যবসা শুরু করার সময়সীমা মাত্র ১৪ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
মন্ত্রী জানান, নতুন পরিকল্পনার আওতায় কোম্পানি নিবন্ধন, কর শনাক্তকরণ নম্বর গ্রহণ, প্রয়োজনীয় অনুমোদনসহ মৌলিক প্রশাসনিক কার্যক্রমগুলোকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অধীনে আনা হবে। এতে উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন দপ্তরে আলাদা আলাদাভাবে যোগাযোগ করার প্রয়োজন কমে যাবে এবং সেবা গ্রহণ প্রক্রিয়া হবে আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ। পাশাপাশি আদর্শ পরিস্থিতিতে কোম্পানি গঠনের ১৫তম দিনের মধ্যেই যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে অনুষ্ঠিত “সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সরবরাহ ব্যবস্থা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং শোভন কর্মসংস্থান এজেন্ডা সমন্বয়” শীর্ষক আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সহযোগিতায়।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সময়সীমা বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সময় বৃদ্ধির সুযোগ নয়; বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিমূলক ধাপ, যার মাধ্যমে দেশকে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা জোরদার এবং উৎপাদন খাতের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে হবে। উত্তরণ-পরবর্তী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন থেকেই কার্যকর প্রস্তুতি গ্রহণ জরুরি।
তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক বাজেটে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, তা সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। ব্যবসা শুরু প্রক্রিয়া সহজীকরণ, লাইসেন্সিং জটিলতা হ্রাস এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু মুনাফার বিষয় নয়, বরং স্বচ্ছতা, টেকসই উন্নয়ন, শ্রম অধিকার, মানবাধিকার সুরক্ষা, পরিবেশগত দায়িত্বশীলতা এবং নৈতিক ব্যবসায়িক আচরণকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং নতুন মানদণ্ডে পুনর্গঠিত হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি “দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ সেল” গঠন করা হয়েছে। এই সেল সরকারি সংস্থা, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করবে।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত করা। এ লক্ষ্যে ধারাবাহিক নীতিগত সংস্কার অব্যাহত থাকবে এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা হবে।
আলোচনায় উপস্থিত বিভিন্ন অংশীজন বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এতে উপস্থিত ছিলেন ইউরোপীয় অঞ্চলের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একজন নির্বাহী সদস্য, জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও জানান, ব্যবসা শুরু প্রক্রিয়া সহজীকরণের জন্য একটি পৃথক কমিটি কাজ করছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধাপে সময় কমানোর সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। আগামী মাসে এই সংস্কার বাস্তবায়নের বিস্তারিত রোডম্যাপ প্রকাশ করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ব্যবসা শুরু সংস্কার পরিকল্পনা
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা | প্রস্তাবিত লক্ষ্য |
|---|---|---|
| ব্যবসা শুরু করার সময় | প্রায় এক বছর পর্যন্ত সময় লাগে | ১৪ দিনের মধ্যে সম্পন্ন |
| কোম্পানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া | একাধিক ধাপে বিভক্ত ও জটিল | সমন্বিত ও দ্রুত অনলাইন ব্যবস্থা |
| যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র | অনুমোদনে বিলম্ব ঘটে | কোম্পানি গঠনের ১৫তম দিনের মধ্যে |
| প্রশাসনিক সমন্বয় | বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত | একীভূত ও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা |
| দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক কাঠামো | সীমিত সমন্বয় বিদ্যমান | নতুন সমন্বয় সেল কার্যকর করা |
এই সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে গতি আসবে এবং স্থানীয় ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরু করা আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
