দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং রপ্তানি খাতের ভিত্তি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক নীতি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে সৃষ্ট পণ্য ও বাজারকেন্দ্রিক ঝুঁকি মোকাবেলা এবং সম্ভাবনাময় অন্যান্য রপ্তানি খাতগুলোর বিকাশে আর্থিক সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে ৩ হাজার কোটি টাকার ‘রপ্তানি বহুমুখীকরণ পুনরর্থায়ন স্কিম’ চালু করা হয়েছে। এ বিষয়ে রবিবার, ৭ জুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন বিভাগ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই বিশেষ স্কিমের মূল লক্ষ্য হলো দেশের রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হার বাড়ানো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ভারসাম্যের টেকসই উন্নয়ন সাধন এবং অপ্রচলিত বিভিন্ন রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
জারি করা প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবহার করে এই ৩ হাজার কোটি টাকার পুনরর্থায়ন তহবিলটি গঠন করা হবে। এটি একটি ঘূর্ণায়মান বা রিভলভিং তহবিল হিসেবে পরিচালিত হবে, যার অর্থ তহবিল থেকে ঋণ পরিশোধের পর সেই অর্থ পুনরায় নতুন ঋণ হিসেবে বিতরণ করা সম্ভব হবে। এই স্কিমের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক অংশগ্রহণকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (পিএফআই) কাছে ৪ শতাংশ সুদে পুনরর্থায়ন সুবিধা প্রদান করবে। আর চূড়ান্ত পর্যায়ে রপ্তানিকারক বা উদ্যোক্তারা এই তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে অর্থায়ন বা ঋণ সুবিধা লাভ করবেন। এই বিশেষ আর্থিক সুবিধার মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে মোট তিন বছর, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ছয় মাসের একটি গ্রেস পিরিয়ড বা রেয়াতকাল অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই ঋণের সুদ হিসাবায়নের ক্ষেত্রে কমতি স্থিতি বা রিডিউসিং ব্যালেন্স পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে।
জাতীয় রপ্তানি নীতি ২০২৪-২৭-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসকল শিল্প খাত ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ এবং ‘বিশেষ উন্নয়ন’ খাতভুক্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, মূলত কেবল সেই শিল্পগুলোই এই পুনরর্থায়ন স্কিমের আওতায় অর্থায়ন সুবিধা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। তবে এই ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামাল ব্যবহারকারী রপ্তানিকারক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করা হবে। দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিশেষত পাট ও চামড়া খাতকে এই স্কিমের আওতায় বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে ঋণ প্রাপ্তির যোগ্যতার বিষয়ে কিছু কঠোর শর্ত ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) প্রতিবেদনে কোনো রপ্তানিকারক বা প্রতিষ্ঠান যদি ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত থাকে, তবে তারা এই সুবিধার আওতায় আসবে না। একই সাথে, যাদের উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে আইনি বকেয়া রয়েছে কিংবা যেসকল প্রতিষ্ঠানের পূর্বে ঋণ অবলোপন বা রাইট-অফ করার ইতিহাস রয়েছে, তারা এই স্কিমের সুবিধা পাওয়ার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। এই স্কিমে অংশ নিতে আগ্রহী ব্যাংক ও অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন বিভাগের সঙ্গে একটি অংশগ্রহণ চুক্তি বা পার্টিসিপেশন অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করতে হবে। প্রজ্ঞাপনে আরও জানানো হয় যে, দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোও সম্পূর্ণ শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ পদ্ধতিতে এই স্কিমের আওতায় গ্রাহকদের অর্থায়ন করতে পারবে, তবে সেক্ষেত্রে স্কিমের নির্ধারিত সুদহার, মুনাফার হার এবং মেয়াদসংক্রান্ত সকল মূল শর্ত অপরিবর্তিত রেখে তা নিখুঁতভাবে মেনে চলতে হবে।
পুনরর্থায়ন সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিটি অর্থ বিতরণের ৯০ দিনের মধ্যে নির্দিষ্ট নথিপত্রসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান নথিপত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিমান্ড প্রমিসরি নোট, লেটার অব কন্টিনিউটি, ডেবিট অথরিটি লেটার এবং আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ সিআইবি প্রতিবেদন। এছাড়া, এই স্কিমের আওতায় অনুমোদিত ও অর্থায়নকৃত সব ধরনের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ঋণ-ইকুইটি অনুপাত ৭০:৩০ বজায় রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এই বিশাল তহভিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি অত্যন্ত কঠোর তদারকি ও জবাবদিহি ব্যবস্থা চালু করেছে। অংশগ্রহণকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে (পিএফআই) প্রতি প্রান্তিক বা কোয়ার্টার শেষ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে তাদের বিস্তারিত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে হবে। পাশাপাশি, তহভিলের যথাযথ ব্যবহার ও কোনো অনিয়ম হচ্ছে কিনা তা যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত বিরতিতে নিজস্ব পরিদর্শনের ব্যবস্থা রাখবে। প্রজ্ঞাপনে সতর্ক করা হয়েছে যে, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ঋণের আবেদন বা নথিতে মিথ্যা তথ্য প্রদান করে অথবা এই বিশেষ তহভিলের অপব্যবহার করে, তবে পুনরর্থায়নের নির্ধারিত স্বাভাবিক সুদের অতিরিক্ত আরও ৫ শতাংশ হারে জরিমানা সুদ বা দণ্ড সুদ আরোপ করা হবে। এই জরিমানার অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে সংরক্ষিত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চলতি হিসাব থেকে সরাসরি কেটে নেওয়া হবে।
এর পাশাপাশি আরও বলা হয়েছে যে, এই স্কিমের কোনো ঋণগ্রহীতা যদি পরবর্তীতে খেলাپی হিসেবে চিহ্নিত হন, তবে সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে লিখিতভাবে অবহিত করতে হবে। এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে, বাংলাদেশ ব্যাংক এককালীন অর্থ কর্তনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চলতি হিসাব থেকে সম্পূর্ণ বকেয়া পুনরর্থায়নের অর্থ সরাসরি আদায় করার পূর্ণ অধিকার রাখবে। দেশের ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলার স্বার্থে ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইন (যা ২০২৩ সালে সর্বশেষ সংশোধিত হয়েছে)-এর ৪৫ ধারার প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ব্যাংক এই বিশেষ স্কিমটি চালু করেছে এবং এটি প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে।
