নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত অর্থ পরিকল্পনায় নতুন সিম কার্ড ক্রয়ের ওপর আরোপিত তিনশ টাকা কর সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সরকারের নীতিগত উদ্দেশ্য হলো দেশের টেলিযোগাযোগ খাতকে আরও গতিশীল, আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব করে তোলা। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আয়ে প্রায় এক হাজার দুইশ কোটি টাকার ঘাটতি সৃষ্টি হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং টেলিযোগাযোগ সেবাখাতকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কর, মূল্য সংযোজন কর এবং লাইসেন্স-সংক্রান্ত নীতিতে বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে এই খাতে মোট করের বোঝা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় বেশি বলে নীতিনির্ধারকদের ধারণা। ফলে খাতটির সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, সিম কর প্রত্যাহারের সরাসরি সুফল সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে পুরোপুরি পৌঁছাবে না। তাদের মতে, এই সুবিধা মূলত সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। ফলে মোবাইল কল বা তথ্য সেবার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা সীমিত। এতে করে সরকারের দেওয়া বড় অঙ্কের কর ছাড়ের প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় আঠারো কোটি হলেও সক্রিয় টেলিযোগাযোগ সংযোগ সংখ্যা প্রায় বত্রিশ থেকে তেত্রিশ কোটির মধ্যে রয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বাজারটি ইতিমধ্যে পরিপক্ব অবস্থায় পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে কর প্রত্যাহার বাজার সম্প্রসারণে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে অর্থনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, বাসাবাড়িভিত্তিক উচ্চগতির তথ্যসেবা এখনো দেশের একটি সীমিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে পৌঁছেছে। মাত্র আট থেকে নয় শতাংশ মানুষের কাছে এই ধরনের সংযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ ডিজিটাল সম্প্রসারণে এই খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু প্রস্তাবিত অর্থ পরিকল্পনায় এই খাতে উল্লেখযোগ্য কোনো কর ছাড় বা বিশেষ প্রণোদনা না থাকায় এর অগ্রগতি ধীরগতির হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের সারসংক্ষেপ নিচে সারণিতে উপস্থাপন করা হলো—
সারণি: কর নীতি পরিবর্তনের সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা | প্রস্তাবিত পরিবর্তন | সম্ভাব্য প্রভাব |
|---|---|---|---|
| নতুন সিম কার্ড কর | তিনশ টাকা | সম্পূর্ণ প্রত্যাহার | প্রায় এক হাজার দুইশ কোটি টাকা রাজস্ব হ্রাস |
| টেলিযোগাযোগ খাতের করহার | তুলনামূলকভাবে বেশি | ধাপে ধাপে হ্রাসের পরিকল্পনা | বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা |
| বাসাবাড়িভিত্তিক তথ্যসেবা প্রবেশাধিকার | আট থেকে নয় শতাংশ | বিশেষ প্রণোদনা অনুপস্থিত | সম্প্রসারণে ধীরগতি |
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই নীতিগত সংস্কারকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা গেলেও এর পূর্ণ সুফল পেতে হলে আরও কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। বিশেষ করে বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ক্ষুদ্র সেবা প্রদানকারীদের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, সিম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব টেলিযোগাযোগ খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হলেও এর বাস্তব প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে এখনো নীতি-নির্ধারক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
