চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতিতে একদিকে প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড়ের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সর্বশেষ ‘আর্টিকেল ফোর কনসালটেশন রিপোর্ট’ অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৮৮ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)-এর প্রায় ৪১ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এই অনুপাত ছিল ৩৯ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আদায়ের তুলনামূলক দুর্বল প্রবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের ঋণ স্থায়িত্ব মূল্যায়নে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর ফলে সংস্থাটি বাংলাদেশকে পূর্ববর্তী ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ’ শ্রেণি থেকে ‘মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ’ শ্রেণিতে উন্নীত করেছে। এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে ঋণের সামগ্রিক বৃদ্ধি, জিডিপির তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ, রপ্তানি আয়ের সীমাবদ্ধতা এবং রাজস্ব আহরণের দুর্বল সক্ষমতা।
আইএমএফের বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারের ঋণ পরিশোধ ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী বছরগুলোতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশকে দেশি ও বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে মোট ৩০ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হবে। তুলনামূলকভাবে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ২৬ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। একইভাবে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে এই ব্যয় আরও বেড়ে ৩৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ পরিশোধ ব্যয়ের ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশই অভ্যন্তরীণ ঋণের জন্য ব্যয় হয়েছে। এই হার উন্নয়নশীল ও সমমানের অন্যান্য অর্থনীতির তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি বলে আইএমএফ উল্লেখ করেছে। অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর এই উচ্চ নির্ভরতা ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি এবং বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
আইএমএফ আরও বলেছে, সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ অব্যাহত রাখলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ সীমিত হতে পারে। এতে বিনিয়োগ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং ইতোমধ্যে চাপের মধ্যে থাকা ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, রাজস্ব আয়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধ ও সুদ ব্যয়ের উচ্চ হার আগামী বছরগুলোতে পুনঃঅর্থায়ন বা রোলওভার ঝুঁকি বাড়াবে। অর্থাৎ, পুরনো ঋণ পরিশোধের জন্য নতুন ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে ৭ শতাংশের নিচে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন স্তর। এই সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা সরকারের জন্য ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধের চাপ সামাল দেওয়া আরও কঠিন করে তুলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় উভয়ই হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ ব্যয় বৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। আইএমএফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামো, সীমিত রাজস্ব আহরণ এবং ঋণনির্ভর অর্থায়নের প্রবণতার কারণে আগামী বছরগুলোতে ঋণ ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে অব্যাহত থাকবে।
