বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা জোরদার এবং আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ৪৫ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক পর্ষদ। এই অর্থায়নের মূল লক্ষ্য হলো দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা, সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো।
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এই ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ঢাকায় সংস্থাটির কার্যালয় থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয়। এই অর্থ ব্যয় করা হবে আর্থিক খাত সহায়তা দ্বিতীয় প্রকল্পের আওতায়।
প্রকল্পটির মাধ্যমে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও সাধারণ আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি আরও কার্যকর করা এবং আর্থিক খাতের জবাবদিহিতা শক্তিশালী করা এই উদ্যোগের প্রধান দিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হবে। এর অংশ হিসেবে আমানত সুরক্ষা তহবিলের মূলধন বৃদ্ধি করে এর কার্যক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি কাঠামো তৈরি করা হবে, যাতে সংকট মোকাবিলা সহজ হয়। ব্যাংক পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশলগত দিকনির্দেশনাও এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার কার্যক্রমেও এটি সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে একাধিক কাঠামোগত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল করপোরেট শাসনব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমাবদ্ধতা এবং অনিয়মিত ঋণ বিতরণের প্রবণতা। এসব কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে, যা পুরো আর্থিক খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় হার ৭ দশমিক ৯ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। এই পরিসংখ্যান ব্যাংক খাতের বর্তমান দুর্বলতার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
এছাড়া গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক বলেন, বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে বড় অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে চায়, তাহলে একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক খাত অপরিহার্য। তবে বর্তমানে ব্যাংক খাত নানা চাপের মধ্যে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ছোট আমানতকারীদের সুরক্ষা বাড়বে, মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও এটি ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পের আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অবকাঠামো আধুনিকায়ন করা হবে। এর ফলে ব্যাংকিং তদারকি আরও শক্তিশালী হবে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
