বন্ধ ও আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদন ও সেবা কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বৃহৎ আর্থিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগের আওতায় ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে, যা দেশের স্থবির শিল্প খাতে গতি ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, তফসিলি ব্যাংকগুলো এই তহবিল থেকে অর্থ গ্রহণ করে সর্বোচ্চ সাত শতাংশ সুদে উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে পারবে। বর্তমানে বাণিজ্যিক পর্যায়ে ঋণের সুদের হার সাধারণত বারো থেকে চৌদ্দ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করে। ফলে তুলনামূলক কম সুদের এই অর্থায়ন শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য স্বস্তি তৈরি করবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা শিল্পগোষ্ঠী সর্বোচ্চ দুইশ কোটি টাকা পর্যন্ত চলতি মূলধন সহায়তা নিতে পারবে। যেসব প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও মূলধনের অভাবে উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে চালু রাখতে পারছে না, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কারখানা পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে এই সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই তহবিলটি মোট ষাট হাজার কোটি টাকার বৃহৎ প্রণোদনা কর্মসূচির অংশ, যা শিল্প ও সেবা খাতের সামগ্রিক পুনরুদ্ধার এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম গতিশীল করার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আশা করা হচ্ছে, এই উদ্যোগ শুধু উৎপাদন বাড়াবে না, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি প্রবাহ বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখবে।
বন্ধ থাকা কারখানা যদি কোনো দক্ষ উদ্যোক্তা অধিগ্রহণ বা ইজারা নিয়ে পুনরায় চালু করেন, সেক্ষেত্রেও তারা এই তহবিল থেকে সহায়তা পাওয়ার যোগ্য হবেন। তবে ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই ঋণ তথ্য ব্যুরোর হিসাবে খেলাপিমুক্ত থাকতে হবে এবং পূর্বে অর্থ আত্মসাৎ বা ঋণ অপব্যবহারের কোনো রেকর্ড থাকা যাবে না।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধি নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যাতে অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যায়। পাশাপাশি শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি ও সম্মাননা দেওয়ার বিষয়টিও নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে শিল্প খাতে বিদ্যমান মূলধন সংকট কিছুটা হলেও লাঘব করবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
নিচে তহবিল সংক্রান্ত প্রধান শর্তাবলি সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো—
| বিষয় | শর্ত |
|---|---|
| তহবিলের মোট আকার | ২০ হাজার কোটি টাকা |
| সর্বোচ্চ অর্থায়ন সীমা | প্রতি প্রতিষ্ঠান বা শিল্পগোষ্ঠী ২০০ কোটি টাকা |
| সুদের হার | সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ |
| প্রচলিত বাণিজ্যিক সুদের হার | ১২ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে |
| লক্ষ্য খাত | বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাত |
| অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান | বন্ধ বা আংশিক বন্ধ কারখানা, রপ্তানিমুখী শিল্প |
| প্রধান শর্ত | খেলাপিমুক্ত থাকা, অর্থ অপব্যবহারের ইতিহাস না থাকা |
সামগ্রিকভাবে এই তহবিলকে দেশের শিল্প পুনরুদ্ধার, উৎপাদন সম্প্রসারণ, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন স্থবির থাকা বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় সচল হয়ে উঠতে পারে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক গতি সঞ্চার করবে।
