আর্থিক খাত এখনো ব্যাংকনির্ভর কাঠামোতে সীমাবদ্ধ অবস্থা রয়েছে

দেশের আর্থিক ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী কিন্তু একমুখী কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ রয়েছে, যেখানে প্রধান ভূমিকা পালন করছে ব্যাংকনির্ভর খাত। বিপুল সংখ্যক অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা খাত, পুঁজিবাজারভিত্তিক মধ্যস্থতাকারী সংস্থা, যৌথ বিনিয়োগ তহবিল এবং মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও তারা জাতীয় অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত অবদান রাখতে পারছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে মোট ৭৬৫টি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা সক্রিয় রয়েছে। এত বড় অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও পুরো আর্থিক খাতে তাদের সম্মিলিত সম্পদের অংশ মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। অপরদিকে ব্যাংকনির্ভর খাত একাই নিয়ন্ত্রণ করছে প্রায় ৭৮ দশমিক ১ শতাংশ সম্পদ, যা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীর অসমতার চিত্র তুলে ধরে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে অ-ব্যাংক আর্থিক খাতের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় এটি ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও এই প্রবৃদ্ধি বাস্তব অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৃদ্ধির বড় অংশই প্রকৃত উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ আর্থিক লেনদেন ও পুনর্বিনিয়োগের ফলাফল।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮৫ শতাংশ সম্পদ ব্যাংকনির্ভর আমানত, সরকারি ঋণপত্র এবং আর্থিক খাতভিত্তিক বিনিয়োগে আটকে রয়েছে। ফলে শিল্প, কৃষি ও উৎপাদনমুখী খাতে সরাসরি ঋণপ্রবাহ সীমিত হয়ে পড়ছে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।

ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও সংকোচন লক্ষ্য করা গেছে। বার্ষিক হিসাবে ঋণ বিতরণ কমেছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে কমেছে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এটি ইঙ্গিত করে যে, বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার ভূমিকা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

দায় কাঠামোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট দায়ের মধ্যে প্রায় ৩২ শতাংশ শেয়ার মূলধন এবং ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে বীমা ও পেনশন সঞ্চয় থেকে। দীর্ঘমেয়াদি তহবিল থাকা সত্ত্বেও তা উৎপাদনশীল খাতে যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না।

দেশের পুঁজিবাজারভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ব্যবস্থা এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। উন্নত অর্থনীতিতে যেখানে এ ধরনের বাজার শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রধান উৎস, সেখানে বাংলাদেশে এটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। ফলে ব্যবসা ও শিল্প খাতের বড় অংশই ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল।

নিচে আর্থিক খাতের সম্পদের সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো—

খাতসম্পদের অংশপ্রধান বৈশিষ্ট্য
ব্যাংকনির্ভর খাত৭৮.১ শতাংশপ্রধান অর্থায়ন উৎস ও উচ্চ নিয়ন্ত্রণ
অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান৪.৬ শতাংশসীমিত ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ দুর্বলতা
বীমা ও পেনশন সঞ্চয়২৩.৫ শতাংশ (দায়ভিত্তিক)দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় নির্ভর কাঠামো
মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবাউল্লেখযোগ্য অংশলেনদেন নির্ভর বিস্তার
অন্যান্য আর্থিক সংস্থাঅবশিষ্ট অংশতথ্য ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সম্পদ বৃদ্ধির প্রধান কারণ তথ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, প্রকৃত অর্থায়ন সক্ষমতার বৃদ্ধি নয়। ২০১৮ সালে যেখানে অ-ব্যাংক আর্থিক খাতের সম্পদ ছিল প্রায় ৯২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৫ সালে তা ২ লাখ কোটি টাকার বেশি হলেও বাস্তব অর্থনীতিতে এর প্রভাব সীমিতই রয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে দেশের আর্থিক কাঠামো এখনো ব্যাংককেন্দ্রিক নির্ভরতা থেকে বের হতে পারেনি। বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় শিল্পায়ন, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য অর্জনের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারছে না।

Leave a Comment