কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই মো. মোস্তাকুর রহমানকে নিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা চলছে। বিশেষ করে তিনি স্বনামে বা বেনামে ঋণখেলাপি কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত জাতীয় বাজেট-পরবর্তী একটি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত সরাসরি প্রশ্ন করা হলে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান নিজেই এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন এবং নিজের অবস্থান সম্পূর্ণ পরিষ্কার করেন।
Table of Contents
বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন ও গভর্নরের বক্তব্য
গত শুক্রবার রাজধানী ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ঘোষিত জাতীয় বাজেট-পরবর্তী ঐতিহ্যগত এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। উক্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সরকারের ১০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং বিশেষ উপদেষ্টার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসেবে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সেখানে সংবাদকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে তিনি নিজের বাণিজ্যিক ঋণ এবং তা পরিশোধের সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন।
নিজের ঋণখেলাপি-সংক্রান্ত অভিযোগ ও প্রশ্নের সরাসরি জবাবে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, “আমি দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই এই বিষয়টি বা ঋণখেলাপির কথা শুনে আসছি।” তিনি নিজের ব্যবসায়ের বিবরণ দিয়ে জানান যে, অতীতে তাঁর একটি পরিবেশবান্ধব বা পরিবেশ-সহায়ক উৎপাদনকারী কারখানা ছিল। সেই কারখানাটি ব্যবসায়িক কার্যক্রমের শুরু থেকে কোনো দিন এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হয়নি। এমনকি প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও উক্ত কারখানা থেকে উৎপাদিত পণ্য বিদেশের মাটিতে রপ্তানি করার প্রক্রিয়া কখনো স্থগিত করা হয়নি। কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের মাসিক বেতন বা পারিশ্রমিক কখনো বকেয়া বা বাকি পড়েনি এবং ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের কোনো অংশ কখনো মওকুফ বা মকুব করা হয়নি।
ঋণের পরিমাণ ও পরিশোধের বর্তমান অবস্থা
নিজের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান আরও কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান যে, প্রাথমিক পর্যায়ে বার্ষিক ৪ শতাংশ সুদের হারে মোট ১৫০ কোটি টাকার একটি বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্যাংকিং নীতির পরিবর্তনের ফলে সেই ঋণের সুদের হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ৯ থেকে ১১ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। এর পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস জনিত মহামারি এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যার কারণে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি বা অর্থ সময়মতো পরিশোধ করার ক্ষেত্রে কিছুটা বিলম্ব বা সময়ের ব্যবধান তৈরি হয়েছিল। তবে তিনি জোর দিয়ে নিশ্চিত করেন যে, ইতিমধ্যে সেই মোট ঋণের মধ্য থেকে ১০০ কোটি টাকা ব্যাংকে সম্পূর্ণভাবে পরিশোধ বা শোধ করে দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ
উক্ত বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো এবং ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন গভর্নর। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা তিন ভাগের এক ভাগ টাকা বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে চুরি বা অপসারিত হয়ে গেছে। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়ার ফলে বা চুরি হওয়ার কারণে দেশের বর্তমান ব্যাংকিং খাতকে পুনরায় স্থিতিশীল, সুসংহত এবং নিয়মের মধ্যে ফিরিয়ে আনা বর্তমান সময়ের জন্য একটি অত্যন্ত বড় এবং জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সংকট উত্তরণে কাজ করে যাচ্ছে।
গভর্নরের ঋণের বিবরণ ও ব্যাংকিং খাতের তথ্যচিত্র
সংবাদ সম্মেলনে প্রদত্ত তথ্য ও বর্তমান পরিস্থিতি নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| বিবরণ ও বিষয়বস্তু | সুনির্দিষ্ট তথ্য ও ফ্যাক্ট |
| সংশ্লিষ্ট পদমর্যাদা | কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর |
| বক্তব্য প্রদানকারীর নাম | মো. মোস্তাকুর রহমান |
| অনুষ্ঠানের নাম ও স্থান | বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন, ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন |
| সংশ্লিষ্ট অর্থবছর | ২০২৬-২৭ অর্থবছর |
| কারখানার ধরন | পরিবেশবান্ধব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান |
| প্রাথমিক ঋণের পরিমাণ ও সুদের হার | ১৫০ কোটি টাকা (৪ শতাংশ সুদে) |
| পরবর্তী সময়ে বর্ধিত সুদের হার | ৯ থেকে ১১ শতাংশ |
| ঋণ পরিশোধে বিলম্বের কারণ | করোনাভাইরাস মহামারি এবং অন্যান্য সমস্যা |
| ইতিমধ্যে পরিশোধিত অর্থের পরিমাণ | ১০০ কোটি টাকা |
| ব্যাংকিং খাতের বর্তমান প্রধান সংকট | ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ টাকা চুরি হওয়া |
